তেহরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাও ভেঙে পড়েনি। বরং পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ইরান পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ায় আবারও যুদ্ধের ছায়া ঘনিয়ে এসেছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলকে ঘিরে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। ব্যাপক বিমান হামলা, শীর্ষ নেতার হত্যাকাণ্ড, পাল্টা আক্রমনের হুমকি- সব মিলিয়ে গোটা অঞ্চল এখন উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে। শুরুতে মনে করা হয়েছিল এই অভিযান দ্রুত ফল দেবে এবং ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই দিন দিন বাড়ছে।
যুদ্ধের শুরু এবং প্রাথমিক লক্ষ্য
ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে দ্রুত দুর্বল করে দেওয়া। ধারণা করা হয়েছিল, তীব্র সামরিক হামলা এবং রাজনৈতিক চাপের ফলে ইরানের ভেতরে জনরোষ তৈরি হবে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হতে পারে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি। চার দিনের মধ্যেই যুদ্ধ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাও ভেঙে পড়েনি। বরং পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ইরান পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ইরান শুধু ইজরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাতেই হামলা চালাচ্ছে না, বরং পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও হুমকি দিচ্ছে।
ইরানের পাল্টা কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন সরাসরি বড় আঘাতের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে। মাঝেমধ্যে বড় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বদলে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দিতে চাইছে। এই কৌশলের লক্ষ্য হল যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলা।
ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার প্রথম ধাক্কায় তাদের নেতৃত্বের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও খুব দ্রুত তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। এখন তাদের কাছে পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা রয়েছে এবং তারা কয়েক মাস পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
মার্কিন প্রশাসনের চাপে পড়া
এদিকে এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চাপে পড়েছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ব্যাপক বিমান হামলা এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার পরও তেহরান আলোচনায় ফেরার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে- এখনই আলোচনায় বসার কোনো প্রশ্নই নেই। বরং তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ট্রাম্প অবশ্য কখনও বলেছেন যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হতে পারে, আবার কখনও বলেছেন এটি পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় চলতে পারে। তার এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত সামরিক বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন কৌশল খুঁজছে।

অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরির দিকেও নজর দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর পাওয়া গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কুর্দি নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। ইজরায়েলের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তেহরানের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন তৈরি করার পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা এই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, এটি বাস্তবসম্মত কোনও পরিকল্পনা নয় এবং ইরান ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় বাড়ছে উত্তেজনা
এই সংঘাত এখন শুধু ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পুরো পশ্চিম এশিয়া জুড়ে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা অন্তত ছয়টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। কারণ তারা আশঙ্কা করছে, এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তাদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
জ্বালানি বাজারে প্রভাব
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ইরান যদি সেখানে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয় বা হামলা চালায়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই এই আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব এবং কাতার তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। উত্তর কোরিয়া ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পিয়ংইয়ং এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে যে সংঘাতটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক কূটনৈতিক উত্তেজনার রূপ নিতে পারে।
সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দ্রুত ভেঙে ফেলা খুব কঠিন। তাই এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে যেখানে দুই পক্ষই দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত। সামরিক অভিযান, কূটনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক শক্তির জটিল সমীকরণের মধ্যে এই সংঘাত কোন দিকে যাবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে একথা নিশ্চিত- এই যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়। এটি এখন বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।