কাকলি ঘোষ দস্তিদার-শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষরা বেছে নিলেন ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়াকেই।

শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই-রবিবার সন্ধ্যার আগে পশ্চিমবঙ্গের ঠিক কতজন এই রাজনৈতিক দলের নাম জানতেন, তা সম্ভবত হাতে গুনে বলে দেওয়া যাবে। আর সেই দলের সঙ্গে মিশে গেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদরা।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের পথে হাঁটলেন না কাকলি ঘোষ দস্তিদারেরা। তৃণমূলে থেকে নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করলেন না লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদরা। তাঁরা আশ্রয় নিলেন নতুন দলে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া বা সংক্ষেপে NCPI। প্রায় অপরিচিত এবং অস্তিত্বহীন একটি দল। সেখানেই যাচ্ছেন তাঁরা। বিদ্রোহী বিধায়কেরা যে পথ দেখিয়েছেন, সেই পথে কেন এগোলেন না লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদরা? এই প্রশ্ন ইতিমধ্যে উঁকি দিতে শুরু করেছে।
বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, কাকলি ঘোষ দস্তিদার-শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষদের নতুন দলের ঠিকানা এরাজ্যেরই হাওড়া জেলার সাঁকরাইল এলাকায়। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জাগো বিশ্ব-র কার্যলয় থেকেই পরিচালিত হয় NCPI-র রেজিস্টার্ড অফিস। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, এই নামের একটি দল ২০২৩ সালে রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়। কমিশন অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলটি ২০২৩ সালে ত্রিপুরায় বিধানসভা ভোটে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। কৈলাসহর এবং চউমানু আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। প্রতীক ছিল কলমের নিব এবং সাতটি রশ্মি। কোনও প্রার্থীই জেতেননি। কৈলাসহর কেন্দ্রে ২৮৬টি ভোট পেয়েছিলেন জাহাঙ্গির আলি। চউমানুর প্রার্থী বড়জেদা ত্রিপুরা পেয়েছিলেন ৫৩৬টি ভোট। বিদ্রোহী সাংসদদের যোগদানের কথা জানার পরই এই পার্টির সদর কার্যালয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে।
তৃণমূলে বিদ্রোহ দু জায়গাতেই হয়েছে-বিধানসভা ও লোকসভা। তবে দু ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিধানসভায় বিদ্রোহীরা তৃণমূল দলের নামটাই যে শুধু ব্যবহার করছেন তাই নয়, তাঁরা বিরোধী বেঞ্চে বসারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্য দিকে, লোকসভার পরিস্থিত ভিন্ন। সেখানে বিদ্রোহীরা এনডিএ-কে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করেছেন। এই দুই ভিন্ন অবস্থান নেওয়া তৃণমূলের দুটি অংশকে এক জায়গায় রেখে আদৌ কি কিছু করা সম্ভব? এই প্রশ্ন গোড়া থেকেই ছিল।
বিধানসভায় পরিষদীয় দলের বিদ্রোহ পরবর্তী পরিস্থিতি দেখে সাবধানী লোকসভার বিদ্রোহীরা। লোকসভায় ভাঙন ধরার আগেই তৃণমূল বিধায়কদের মধ্যে বিদ্রোহ প্রকট হয়। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেন বিদ্রোহী বিধায়কেরা। তিনিই এখন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। তৃণমূলের সিংহভাগ বিধায়কের সমর্থনও রয়েছে তাঁর প্রতি। কিন্তু তা নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত কেউ কীভাবে বিরোধী দলনেতা হতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টে মামলা করেছে তৃণমূল। এই মামলা এখনও বিচারাধীন। আইনি দিক বিবেচনা করেই বিদ্রোহী সাংসদেরা ঝুঁকি এড়িয়ে গেলেন।
বিধানসভার বিদ্রোহীদের চেয়ে ভিন্ন অবস্থান এবং আইনি জটিলতা এড়াতেই লোকসভায় বিদ্রোহীরা ভিন্ন দলে গিয়ে মিশলেন, এই সম্ভাবনার কথাই তুলে ধরছেন রাজনীতিকরা।
গোটা প্রক্রিয়ার পরিচালক যে বিজেপি এটা নিয়ে সংশয় নেই। বিদ্রোহী সাংসদদের প্রথম বৈঠকটিই হয়েছে বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাংলোতে। তারপরে গত ছয়-সাত দিনে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে এবং তার প্রায় সিংহভাগই হয়েছে ভূপেন্দ্রর বাড়িতেই। রবিবারও ভূপেন্দ্রর বাড়িতে বৈঠক হয়েছে। তখন সেখানে অপর বিজেপি নেতা নিশিকান্ত দুবেও ছিলেন। বিজেপি নেতার বাড়িতে গিয়ে বৈঠক নিয়ে দৃশ্যত কোনও রাখঢাক নেই বিদ্রোহীদের মধ্যে। যদিও গত কয়েকদিনে বিজেপি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেনি।
আবার বর্তমান পরিস্থিতি এদের সকলকে দলে নেওয়ার মতো কোনও ইচ্ছাও বিজেপি দেখায়নি। বিজেপি এদের কাজে লাগানোর বিষয়ে যতটা উৎসাহী, দলে নেওয়ার বিষয়ে ততটা নয়।
লোকসভায় সংসদীয় দলকে মমতা নিয়ন্ত্রণ থেকে বার করে নিতে পারলেও তৃণমূল দলের নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীরা নিতে পারবেন না। এই আশঙ্কা থেকেই নতুন দলের আশ্রয় নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ, পরিষদীয় দল এবং সংসদীয় দল হাতছাড়া হওয়ার আভাস পেতেই দলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেন মমতা। তার পরে নতুন করে সেই পদগুলি পছন্দমতো নেতাদের বসান, যাঁরা বিদ্রোহী নন।
এক্ষেত্রে বলে রাখা দরকার, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তৃণমূল চেয়ারপার্সন কেন্দ্রিক দল। নির্বাচন কমিশনের কাছে পার্টির গঠনতন্ত্র জমা দেওয়া আছে। ১৯৯৮ সালে যখন তৃণমূল তৈরি হয়েছিল, তখন মুকুল রায় দলে যে সংবিধান জমা দিয়েছিলেন সেখানে স্টেট এক্সিকিউটিভ কমিটিকে সর্বোচ্চ ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটি বলে উল্লেখ করা ছিল। পরে সংশোধনীতে জাতীয় কর্মসমিতিকে শীর্ষ কমিটি হিসাবে ব্যাখা করা হয়। সেই জাতীয় কর্মসমিতিও চেয়ারপার্সন কেন্দ্রিক। অর্থাৎ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে সাংগঠনিক পদাধিকারীদের দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি।
কংগ্রেস-তৃণমূল মিশে গেলে দলত্যাগবিরোধী আইনের আওতায় পড়ার সম্ভাবনা ছিল বিদ্রোহীদের। সম্প্রতি গান্ধী পরিবারের সঙ্গে মমতা-অভিষেকের পৃথক পৃথক বৈঠকের পর খবর ছড়ায়-কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে মমতা তৃণমূল। যদিও পরে সেই সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিয়েছে কংগ্রেস। তবে এমন কিছু ঘটলে দলত্যাগবিরোধী আইনের আওতায় পড়তে পারতেন বিদ্রোহীরা। আগেভাগে বিদ্রোহীরা পৃথক দলের আশ্রয় নেওয়ার নেপথ্যে এটি একটি কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। বর্তমানে তৃণমূলের সংসদীয় দলে রয়েছেন ২৮জন। দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন বিদ্রোহীদের। যা বর্তমান হিসাবে তাঁদের হাতে রয়েছে।
লোকসভায় তৃণমূলের এই ভাঙনপর্ব প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত সোমবার। কাকলি-শতাব্দীদের নেতৃত্বে তৃণমূলের প্রায় ২০ জন সাংসদ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ঘটনাচক্রে, মমতা-অভিষেক সে দিন ছিলেন দিল্লিতেই, বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার বৈঠকে। তার সপ্তাহ ঘোরার মধ্যেই এ বার ভেঙে তৃণমূল ছেড়ে নতুন দলে আশ্রয় নেওয়ার কথা ঘোষণা করে দিলেন বিদ্রোহীরা। যে দলে তাঁরা যাচ্ছেন, তার নাম রবিবার বিকেলের আগে কেউই প্রায় জানতেন না। বিদ্রোহী সাংসদ অরূপ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, দলটি ত্রিপুরার। কিন্তু ত্রিপুরার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাকা মাথার নেতারাও ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ার নাম শুনে মাথা চুলকোচ্ছেন।