আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : স্মার্টফোন আজ হাতের মুঠোয় চলে এলেও ফসকে যাচ্ছে আমাদের মনের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি। সোশ্যাল মিডিয়ার অবিরাম স্ক্রল, ‘লাইক’-এর নির্ভরতা, অ্যালগরিদমের অদৃশ্য টান—সব মিলিয়ে উদ্বেগ, নিদ্রাহীনতা ও বিষণ্নতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তি এক নীরব মহামারি হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষিতে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির অধীনে ‘টেলি-মানস’ (Tele-MANAS) উদ্যোগকে সামনে এনে এক ডিজিটাল সুরক্ষা-কবচ গড়ে তুলেছে কেন্দ্র সরকার।

২৪ ঘণ্টার ভরসা
টেলি-মানসের টোল-ফ্রি হেল্পলাইনে (১৪৪১৬ বা ১-৮০০-৮৯১-৪৪১৬) সর্বক্ষণ পরিষেবা মিলবে এবং এটি সম্পূর্ণ গোপনীয়। ফোন করলেই প্রাথমিক কাউন্সেলিং মিলছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি ‘ডিজিটাল-ফার্স্ট’ সহায়তা—চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামাজিক সংকোচ বা সময়সাপেক্ষতা এখানে নেই। এক কলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে সাহায্য।
২ স্তরের সহায়তা কাঠামো
এই পরিষেবার কাঠামো ধাপে ধাপে সাজানো। প্রথম স্তরে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলররা প্রাথমিক মানসিক সমর্থন ও সঙ্কট মোকাবিলার পরামর্শ দেন। পরিস্থিতি জটিল হলে—যেমন তীব্র ডিজিটাল আসক্তি, ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বা আত্মহানির প্রবণতা—রোগীকে দ্বিতীয় স্তরে পাঠানো হয়। সেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সঙ্গে ই-সঞ্জীবনী প্ল্যাটফর্মে বা নিকটবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করানো হয়। অর্থাৎ হেল্পলাইন কেবল ‘কথার’ জায়গা নয়, প্রয়োজনে চিকিৎসার সেতুবন্ধন।
স্থানীয় ভাষায়, স্থানীয় মানুষের জন্য
দেশজুড়ে ৫০-এর বেশি কার্যকরী সেল এবং ২০টিরও বেশি আঞ্চলিক ভাষায় পরিষেবা—এই উদ্যোগের বড় শক্তি। সস্তা ডেটার দৌলতে গ্রামীণ যুবকেরাও দ্রুত অনলাইনে আসছেন। তাঁরা মাতৃভাষায় সহায়তা না পেলে মানসিক সঙ্কট আরও গভীর হতো। টেলি-মানস সেই ব্যবধান কমাতে চেয়েছে।
সহায়ক উদ্যোগগুলির জাল
ডিজিটাল আসক্তি মোকাবিলায় সমান্তরাল উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বেঙ্গালুরুর নিমহ্যান্স (NIMHANS) ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ ক্লিনিক চালু করেছে, যেখানে ‘ইনফরমেশন হাইজিন’ ও কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)-র মাধ্যমে ডোপামিন-নির্ভর আচরণ ভাঙার পদ্ধতি শেখানো হয়।
শিক্ষামন্ত্রকের ‘মনোদর্পণ’ প্ল্যাটফর্ম ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ নির্দেশিকা দিচ্ছে—‘ডিজিটাল ফাস্টিং’, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ, এবং পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্তির পরামর্শ। স্কুলস্তরেই সচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
এ ছাড়া প্রস্তাবিত ‘সেফটি মিত্র’ পোর্টাল—নতুন ডিজিটাল আইনের অংশ হিসেবে—অ্যালগরিদমিক ক্ষতিকর কনটেন্ট, যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের আত্মহানি বা খাওয়াদাওয়ার বিকার প্ররোচিত করে, তা রিপোর্ট করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।
চিকিৎসা থেকে প্রতিরোধে
টেলি-মানস আপাতত সঙ্কটের চিকিৎসা দিচ্ছে। তবে সরকার এখন জোর দিচ্ছে প্রতিরোধে—গ্রামীণ স্কুলে ডিজিটাল সাক্ষরতা, দায়িত্বশীল ব্যবহার ও মানসিক স্বাস্থ্যের পাঠ অন্তর্ভুক্ত করার উপর। উদ্দেশ্য, আসক্তির প্রথম ঢেউ যেন শিকড় না গাড়ে।
প্রশ্ন থেকেই যায়—পরিষেবার পরিধি ও জনবল কি বাড়তি চাহিদা সামলাতে পারবে? তবু স্বীকার করতে হয়, ডিজিটাল যুগে মানসিক সুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার এই পদক্ষেপ সময়োচিত। প্রযুক্তি যদি সমস্যার উৎস হয়, তবে প্রযুক্তিকেই সেতু করে সমাধানের পথে হাঁটাই বুদ্ধিমানের কাজ।