শুক্রবার রাতে এক্স হ্যান্ডেলে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তুমুল চর্চা। একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে উঠে আসে মেনকার নাম।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির যে দাবি উঠে আসছিল তারই এক ঐতিহাসিক প্রতিফলন দেখা গেল তৃণমূলের কংগ্রেসের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে। আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনে বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী মেনকা গুরুস্বামীকে প্রার্থী করে দেশবাসীর সামনে এক সাহসী ও যুগান্তকারী বার্তা দিল তৃণমূল। তৃণমূল শুধু রাজনৈতিক চমকই দেয়নি, বরং সমাজের বহু আলোচিত এলজিবিটিকিউ অধিকার আন্দোলনের প্রতিও সম্মান জানিয়েছে। এই মনোনয়নের ফলে, জয়ী হলে, ভারত প্রথমবারের মতো রাজ্যসভায় একজন প্রকাশ্য সমকামী সংসদ পেতে চলেছে। যা নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় মাইলফলক। শুক্রবার রাতে এক্স হ্যান্ডেলে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তুমুল চর্চা। একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে উঠে আসে মেনকার নাম। যা মুহূর্তের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও মেনকা কখনও পারিবারিক পরিচয়ের ছায়ায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর বাবা মোহন গুরুস্বামী বিজেপির প্রাক্তন কৌশলী ও বাজপেয়ী সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহার বিশেষ উপদেষ্টা ছিলেন। কিন্তু সেই উত্তরাধিকারকে নয়, নিজের মেধা ও পরিশ্রমকেই পাথেয় করে মেনকা গড়ে তুলেছেন নিজস্ব পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পরিচিতি মেনকা। ন্যাশনাল ল স্কুল, হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বের প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তাঁর নির্ভীক ও যুক্তি নির্ভর সওয়াল তাঁকে দ্রুতই পরিচিত মুখ করে তোলে।

আইনজীবী হিসেবে মেনকার কর্মজীবন জুড়ে রয়েছে
একের পর এক সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা
ছড়িশগড়ের মাওবাদী দমনে গঠিত সলওয়া জুড়ুমের বিরুদ্ধে লড়াই
মণিপুরে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা ভুয়ো এনকাউন্টার
মামলায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে দায়িত্ব পালন
অগুস্তা ওয়েস্টল্যান্ড ভিভিআইপি কপ্টার দুর্নীতি মামলায়
প্রাক্তন বায়ুসেনা প্রধান এসপি ত্যাগীর পক্ষে সওয়াল
প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি দেখিয়েছেন অসাধারণ দক্ষতা ও দৃঢ়তা। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক অধ্যায় আসে ২০১৮ সালে, যখন সুপ্রিম কোর্টে ৩৭৭ ধারা বাতিলের লড়াইয়ে তিনি ও তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী আইনজীবী অরুন্ধতী কাটজু নেতৃত্ব দেন। সেই রায়ের ফলেই ভারতে সমকামিতা অপরাধমুক্ত হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে মুক্তির নতুন দিগন্ত খুলে যায়। এই যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় জায়গা করে নেন তাঁরা দুজনেই। সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমলের আইপ্যাক মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেও মেনকা নতুন করে আলোচনায় আসেন। শুনানিতে অ্যাডিশনাল সলিসিটার জেনারেল এসভি রাজুর সঙ্গে তাঁর তীব্র বাকবিকণ্ডা রাজনৈতিক মহলে বিশেষ চর্চার জন্ম দেয়। এই সমস্ত অভিজ্ঞতা, সাহস ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ই তাঁকে রাজ্যসভা প্রার্থী হিসেবে এক ব্যতিক্রমী উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তকে তাই অনেকেই দেখছেন প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে। মেনকাকেই রাজ্যসভায় মনোনয়ন দিয়েছে তৃণমূল। জয়ী হলে তিনিই হবেন প্রথম সমকামী সাংসদ। তৃণমূলের এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন, তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না।
মেনকা গুরুস্বামীর এই মনোনয়ন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়। বরং এটি ভারতের সামাজিক বিবর্তনের এক শক্তিশালী প্রতীক। সংসদের অন্দরে তাঁর কণ্ঠস্বর পৌঁছালে তা শুধু আইন ও নীতিনির্ধারণের নয়, সমাজের মানসিকতাতেও গভীর প্রভাব ফেলবে। বহুদিনের লড়াই, অগণিত স্বপ্ন ও অদম্য সাহসের সমষ্টিতে তৈরি এই মুহূর্ত ইতিহাসে লেখা থাকবে। যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সমানাধিকারের পথচলা এক নতুন দিশা খুঁজে পাবে।
শুক্রবার রাতে এক্স হ্যান্ডেলে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তুমুল চর্চা। একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে উঠে আসে মেনকার নাম।