সরকারি আবাস যোজনায় গরিব মানুষের পাকা বাড়ির স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নপূরণের নাম করে যদি টাকা চাওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে কি দিতে হচ্ছে কাটমানি? মালদার হরিশচন্দ্রপুরে এমনই অভিযোগকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে। অভিযোগ, আবাস যোজনার ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে কারও কাছ থেকে ৮ হাজার, আবার কারও কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের আঙুল স্থানীয় তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য সীমা মণ্ডল এবং তাঁর স্বামী স্বপন মণ্ডলের দিকে। টাকা নেওয়ার পরেও ঘর মেলেনি এই অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখালেন গ্রামবাসীদের একাংশ। জ্বালানো হয় টায়ার। পাশাপাশি প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে বিডিওর কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বজিত মণ্ডল, নিজস্ব সংবাদদাতা
কী অভিযোগ উঠছে? কারা টাকা দিয়েছেন? টাকা নেওয়ার পর কী হয়েছে? আর অভিযুক্ত পঞ্চায়েত সদস্যের বক্তব্যই বা কী?মালদার হরিশ্চন্দ্রপুরে অভিযোগের কেন্দ্র মালিওর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের অর্জুনা এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, আবাস যোজনায় ঘর পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল। কারও কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা। আবার কারও কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকা। বিজেপি সমর্থক হওয়ার জন্য চক্রান্ত করে উপভোক্তাদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, টাকা দেওয়ার পর তাঁরা আশা করেছিলেন সরকারি আবাস যোজনার তালিকায় তাঁদের নাম থাকবে এবং তাঁরা পাকা বাড়ি তৈরির সুযোগ পাবেন। কিন্তু অভিযোগ, টাকা দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত অনেকের নাম তালিকায় জায়গা পায়নি। আর এখানেই ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। কারণ যাঁদের নিজেদের বাড়ি তৈরি করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই, যাঁদের মাথার উপর পাকা ছাদ নেই তাঁদের কাছ থেকেই যদি সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়া হয়, তাহলে সেই টাকা কোথায় গেল, সেই প্রশ্নই তুলছেন অভিযোগকারীরা।

এই ঘটনায় অভিযোগের আঙুল উঠেছে স্থানীয় তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য সীমা মণ্ডল এবং তাঁর স্বামী স্বপন মণ্ডলের দিকে। গ্রামবাসীদের একাংশের অভিযোগ, আবাস যোজনার ঘর পাইয়ে দেওয়ার নামেই তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল। সব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছে তৃণমূল। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সরকারি প্রকল্পে ঘর পাওয়ার আশায় তাঁরা নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে টাকা জোগাড় করেছিলেন। কেউ ধার করেছিলেন। কেউ সংসারের প্রয়োজনীয় টাকা থেকে দিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরেও যখন ঘর এল না, তখনই ক্ষোভ বিস্ফোরণের চেহারা নেয়।
অভিযোগের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার রাস্তায় নামেন ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের একাংশ। শুরু হয় বিক্ষোভ। রাস্তার উপর টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ দেখানো হয়। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য শুধু টাকা নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত করলেই হবে না, প্রকৃত উপভোক্তাদের তালিকা খতিয়ে দেখতে হবে। কে আবাস যোজনার যোগ্য? কার নাম তালিকায় রয়েছে? কার নাম বাদ পড়েছে? আর যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের টাকা কোথায় গেল?এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর চান বিক্ষোভকারীরা।
রাস্তায় বিক্ষোভ দেখিয়েই থামেননি অভিযোগকারীরা। গোটা ঘটনার তদন্ত চেয়ে প্রশাসনের কাছেও লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে। বিডিওর কাছে চিঠি দিয়ে অভিযোগ জানানো হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। অভিযোগকারীদের দাবি, আবাস যোজনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পে যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। প্রকৃত উপভোক্তাদের তালিকা যাচাই করতে হবে।কাদের বাড়িতে সমীক্ষা হয়েছে, কাদের নাম তালিকায় এসেছে, কারা বাদ পড়েছেন সবটাই খতিয়ে দেখতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেই অভিযোগেরও তদন্ত হওয়া দরকার। এই ঘটনা সামনে আসতেই তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ করেছে বিজেপি।
মালদায় আবাস যোজনাকে ঘিরে টাকা নেওয়া বা অনিয়মের অভিযোগ অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি আবাস প্রকল্পে টাকা চাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে মালদার মানিকচকের একটি ঘটনায় আবাসের ঘর পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগে তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান এবং তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনায় টাকা দিয়েও ঘর না পাওয়ার অভিযোগ তুলে বিডিও অফিসে বিক্ষোভ করেছিলেন উপভোক্তাদের একাংশ। আবার হরিশ্চন্দ্রপুরের অন্য একটি পঞ্চায়েত এলাকাতেও আবাস যোজনার সমীক্ষা নিয়ে টাকা চাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে নতুন করে অর্জুনা গ্রামের এই অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে সরকারি আবাস প্রকল্পের সুবিধা কি সত্যিই প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছচ্ছে?