ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসে কাঁপছে ত্রিপুরা !

এডিসিতে বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে তিপ্রামথা। তবে এই জয়ের আবহের মধ্যেই রাজ্যের একাধিক জায়গা থেকে হিংসা, হামলা, ভাঙচুর ও আতঙ্কের খবর সামনে আসে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ভোট মিটেছে। ফলও সামনে এসেছে। তবুও ত্রিপুরার একাধিক এলাকায় হিংসাত্মক ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। ত্রিপুরায় এডিসি নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে গোটা রাজ্যে উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। শুক্রবার ভোটগণনা এগোতেই স্পষ্ট হয়ে যায় প্রদ্যোৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মার নেতৃত্বাধীন তিপ্রামথা দল বড় জয়ের দিকে এগোচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, এডিসিতে বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে তিপ্রামথা। তবে এই জয়ের আবহের মধ্যেই রাজ্যের একাধিক জায়গা থেকে হিংসা, হামলা, ভাঙচুর ও আতঙ্কের খবর সামনে আসে। যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তোলে। সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ছড়ায় সিপাহীজলার বিশ্রামগঞ্জ এলাকায়। ১৯ আমতলী-গোলাঘাটি কেন্দ্রে তিপ্রামথা প্রার্থী বুদ্ধ কুমার দেববর্মার রেকর্ড জয়ের পর থেকেই সেখানে সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বিজেপি কর্মী ও সমর্থকদের দাবি, তাঁদের বাড়িঘর, দোকানপাটে হামলা চালানো হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও বোমাবাজি ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। বিজেপির বুথ সভাপতি ও কর্মীদের লক্ষ্য করেই হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ। আক্রান্তদের বক্তব্য নিজেদের সরকার থাকা সত্ত্বেও এই কঠিন সময়ে দলের অনেক নেতাকর্মীকেই পাশে পাওয়া যায়নি। সাহায্যের আবেদন জানিয়েও সাড়া মেলেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

বিশ্রামগঞ্জ ছাড়াও মনু-বনকুল অঞ্চল কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। বিজেপির তিনটি দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। ২৮-শিলাছড়ি-মনু বনকুল কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী কংজং মগ ৪৯৪ ভোটে পুনরায় জয়লাভ করেন। তবে সামগ্রিকভাবে ২৮টি আসনের মধ্যে ২৪টিতে প্রদ্যোৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মার নেতৃত্বাধীন তিপ্রামথা দল জয়লাভ করায় বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ, জয়ের উচ্ছ্বাসে তিপ্রামথা সমর্থকদের একাংশ উগ্র রূপ ধারণ করে। মনু-বনকুল এলাকার চালিতা বনকুল বটতলা বাজার, মডেল মারগো পাড়া এবং বিষ্ণুপুরে বিজেপির তিনটি কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। দলীয় নথিপত্র ও আসবাবপত্রও তছনছ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। শুধু দলীয় কার্যালয় নয়। ঘোড়াকাপ্পা এলাকায় কয়েকটি বাঙালি পরিবারের বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।  এলাকায় পুলিশ টহল শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনও থমথমে। স্থানীয়দের দাবি দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে এনে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এছড়াও খোয়াই, তেলিয়ামুড়া, জিরানিয়া, সাব্রম-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও রাজনৈতিক অশান্তির খবর পাওয়া যায়। জিরানিয়ার কালাবাগান এলাকায় বিজেপি প্রার্থী অভিজিৎ দেববর্মার ওপর হামলা ও বাড়িঘর পোড়ানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। সিমনা-তামাক্কারি অঞ্চলে হিংসার আশঙ্কায় বহু পরিবার ঘরছাড়া হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে গিয়েছেন বলেও জানা যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, বোমাবাজি ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে বলে খবর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন তৎপর হয় এবং বিশ্রামগঞ্জ থানার পুলিশ রাতেই এলাকায় পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। এই ফলাফল রাজৈনিতক দিক থেকেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। পাঁচ বছর আগে এডিসি নির্বাচনে বিজেপি ১৩টি আসনে লড়ে ৯টি আসনে জয় পেয়েছিল। তখন তিপ্রমথা বিজেপির শরিক ছিল না। সেই নির্বাচনে তিপ্রামথা এককভাবে ১৬টি আসন জিতে পরিষদের ক্ষমতা দখল করেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজেপি ২৮টি আসনে লড়েও জয় পেয়েছে মাত্র চারটিতে। ফলে স্পষ্ট হয়েছে পাহাড়ি রাজনীতিতে তিপ্রামথার প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে।

২০২০ সালে কংগ্রেস ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন প্রদ্যোৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মা। পরে ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তিপ্রামথা প্রধান বিরোধী দল হলেও পরে বিজেপি সরকারের শরিক হয়। কিন্তু সরকারে থাকার পরও এডিসি নির্বাচনে বিজেপি ও তিপ্রামথার মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট ছিল। তারই প্রভাব ভোটের ফলাফলেও দেখা গেল বলে মত রাজনৈতিক মহলে। তবে জয়ের পর বার্তা দিয়েছেন প্রদ্যোৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মা। তিনি তিপ্রামথা সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই জয় কোনো জাতি বা ধর্মের বিরু্দ্ধে নয় এটি মানুষের আস্থার জয়। বিজয়ের আনন্দে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যাতে ত্রিপুরার সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট নয়। প্রতিহিংসা নয়, এখন প্রয়োজন উন্নয়ন, ঐক্য ও মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

২০২৮ সালে ৬০ আসনে ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচন। শুক্রবারের এই ফল শুধু তিপ্রামথা একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং ত্রিপুরার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ এবং ভবিষ্যতের নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যা রাজ্যের শাসকদল বিজেপির কাছে কার্যত অ্যাসিড টেস্ট হতে চলেছে।