চিদম্বরমের বিরুদ্ধে চার্জশিট

ইডির দাবি, বেআইনি সুবিধা বা ঘুষের টাকা, যা বাবা ও ছেলে দুজনেই ব্যবহার করেছেন। ‘ঘুষ’ কতটা গভীরে ?

রিয়া দাস, সাংবাদিক : রাজনীতির অন্দরে ফের একবার ঝড় তুলল ইডির বড়সড় পদক্ষেপ। দীর্ঘ তদন্তের পর কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম এবং তাঁর ছেলে কংগ্রেস সাংসদ কার্তি চিদাম্বরমের বিরুদ্ধে এয়ারসেল-ম্যাক্সিস ও আইএনএক্স মিডিয়া সংক্রান্ত দুটি মানি লন্ডারিং মামলায় দ্রুত বিচার শুরু করার জন্য দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউয়ের বিশেষ পিএমএলএ আদালতে আবেদন জানিয়েছে ইডি। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন জমা দেওয়ার ফলে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা এই দুই হাই-প্রোফাইল মামলার বিচার প্রক্রিয়া অবশেষে নতুন গতি পেতে চলেছে। ইডি জানিয়েছে, এয়ারসেল-ম্যাক্সিস মামলায় ২০১৮ সালে ও আইএনএক্স মিডিয়া মামলায় ২০২০ সালে চার্জশিট দাখিল করা হলেও, ২০২৪ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ের পর মামলার অনুমোদন সংক্রান্ত আইনি জটিলতার বিচার বিলম্বিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে জানায়, পিএমএলএ আইনের অধীনে চার্জশিট দাখিলের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এই নির্দেশের পর বহু অভিযুক্ত আদালতের দ্বারস্থ হলে দেশজুড়ে একাধিক মানি লন্ডারিং মামলার বিচার থমকে যায়। সেই তালিকাতেই ছিল পি চিদাম্বরমের নাম। তবে এই জট কাটিয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেয়েই এবার দ্রুত বিচার চেয়ে আদালতে নথি জমা দিয়েছে ইডি।

কী অভিযোগ ইডির ?

এয়ারসেল-ম্যাক্সিস চুক্তির ক্ষেত্রে পি চিদম্বরম
তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রায় ৩,৫৬০কোটি টাকার
বিদেশি বিনিয়োগের বেআইনি অনুমোদন দিয়েছিলেন
নিয়ম অনুযায়ী, তিনি সর্বোচ্চ ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত
বিনিয়োগে ছাড়পত্র দিতে পারতেন, এর বেশি অঙ্কের
ক্ষেত্রের অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন ছিল
অভিযোগ, সেই কমিটির নজর এড়াতে বিনিয়োগের অঙ্ক
কাগজে-কলমে কম দেখিয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়
এর বিনিময়ে কার্তি চিদাম্বরমের নিয়ন্ত্রিত সংস্থা অ্যাডভান্টেজ
স্ট্র্যাটেজিক কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেড ও চেস ম্যানেজমেন্ট
সার্ভিসেসের মাধ্যমে ১.১৬ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া হয় বলে দাবি ইডির

এই অর্থ আসলে ছিল বেআইনি সুবিধা বা ঘুষের টাকা, যা বাবা ও ছেলে দুজনেই ব্যবহার করেছেন। শুধু তাই নয় ইডি আরও জানিয়েছে, এই অবৈধ অর্থ একাধিক ভুয়ো সংস্থা ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে ধাপে ধাপে লেনদেনের মাধ্যমে সাদা করা হয়। পরে সেই অর্থ শেয়ার বাজারে ও স্বাস্থ্য খাতের বড় সংস্থার বিনিয়োগ করে বহুগুন বাড়ানো হয়। আইএনএক্স মিডিয়া মামলাতেও একই ধরনের আর্থিক কারচুপি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। ইডির দাবি, বিদেশি বিনিয়োগ প্রচার বোর্ডের অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বেআইনিভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। যা স্পষ্ঠতই মানি লল্ডারিং আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। যদি পি চিদম্বরম ও কার্তিচিদাম্বরম প্রথম থেকেই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁদের দাবি, এই মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী নেতাদের দমন করতেই তদন্তকারী সংস্থাগুলুকে ব্যবহার করছে। তবে ইডির তরফে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পাওয়া এবং আদালতে দ্রুত বিচার চাওয়ার ফলে এই যুক্তি যে খুব বেশি কাজে আসবে না তা মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই দুর্নীতি মামলার বিচার শুরু হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়েছে। একদিকে কংগ্রেসের অন্যতম প্রভাবশালী পরিবারের ভবিষ্যৎ। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা। সব মিলিয়ে এই মামলার রায় আগামী দিনে ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। এখন নজর শুধু আদালতের দিকে। এই বহুল আলোচিত মামলার চূড়ান্ত পরিণতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায় সেটাই দেখার। তবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এয়ারসেল-ম্যাক্সিস ও আইএনএক্স মিডিয়া মামলার মতো দুর্নীতি অভিযোগ নিঃসন্দেহে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে থাকবে। এই ধরনের দুর্নীতি শুধু সরকারি কোষাগারের বিপুল আর্থিক ক্ষতি করে না। বরং সাধারণ মানুষের আস্থা, গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার উপরও মারাত্মক আঘাত হানে। যখন দেশের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে, তখন তো স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে দেশের শাসনব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক?

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন একদিকে ন্যায়বিচারের আশা জেগেছে। তেমনই অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার জোরে সত্য চাপা পড়ে যাবে কি না সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই মামলার রায় তাই দেশের দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের ভবিষ্যতের দিশাও ঠিক করে দেবে। যদি কঠোর ও নিরপেক্ষ বিচার হয় তবে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। আর যদি প্রভাবশালী মহলের চাপেই সবকিছু চাপা পড়ে যায়, তবে তা গণতন্ত্রের উপর এক গভীর কালো ছায়া ফেলবে। এই কারণেই গোটা দেশ আদালতের দিকে তাকিয়ে। এই প্রত্যাশা যে সত্য সামনে আসবে, দুর্নীতির মুখোশ খুলে যাবে। দেশের মানুষ চায় ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর দুর্নীতিকে হাতিয়ার করে দেশের সম্পদ লুটে নেওয়ার সাহস না পায়।