ট্রাম্পের মুখে ‘জ্ঞানেশ’ প্রসঙ্গ !

সরাসরি ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নাম করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে বিতর্ক নতুন নয়। নির্বাচনের সময় বিরোধীদের বিতর্কের মুখে পড়েন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। কিন্তু সেই নির্বাচন প্রক্রিয়াই এবার আন্তর্জাতিক রাজনীতির একেবারে কেন্দ্রে চর্চায়। তবে বিতর্ক হিসেবে নয়, একেবারে সুনামের সঙ্গে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আরও কড়াকড়ির পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরলেন ভারতের ভোটপ্রক্রিয়াকে। শুধু নির্বাচন প্রক্রিয়া নয়, সরাসরি ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ নাম করলেন ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের। ট্রাম্পের দাবি, “চলতি মাসের গোড়ায় জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে কথোপকথনের সময় তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আমেরিকায় বৈধ সচিত্র পরিচয়পত্র ছাড়াই কীভাবে ভোট দেওয়া সম্ভব? সেই কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনেই ট্রাম্প ফের জোরালো ভাবে সামনে আনলেন তাঁর বহুদিনের দাবি, আমেরিকার নির্বাচনে ভোটার পরিচয় যাচাই আরও কঠোর করতে হবে ও নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।’

ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টে ভারতের ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ করেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতের মোট নথিভুক্ত ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৭.৯৮ কোটি। তার মধ্যে ইভিএম ও পোস্টাল ব্যালট মিলিয়ে মোট ভোট পড়েছিল প্রায় ৬৪.৬৪ কোটি। অর্থাৎ ট্রাম্পের উল্লেখ করা ৬৪ কোটি ৬০ লক্ষ সংখ্যাটি আসলে ভোট পড়ার সংখ্যা, মোট ভোটারের সংখ্যা নয়। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে প্রায় ৪২.৮২ লক্ষ ভোট পোস্টাল ব্যালটে পড়ে। যা মোট ভোটের প্রায় ০.৬৬ শতাংশ।

ভারতের ভোটপ্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রে ভোটারকে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হয়। ভোটার কার্ডের পাশাপাশি আধার, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, প্যান কার্ড, ছবি-সহ ব্যাংক বা পোস্ট অফিসের পাসবুক-সহ একাধিক অনুমোদিত পরিচয়পত্র দেখানো যায়। অর্থাৎ ভারতের ক্ষেত্রে শুধু ভোটার কার্ড থাকলেই ভোট দেওয়া যাবে বিষয়টি এমন নয়। নির্দিষ্ট তালিকায় থাকা বিকল্প সচিত্র পরিচয়পত্র দিয়েও ভোটার তাঁর পরিচয় প্রমাণ করতে পারেন। এই ভারতীয় ব্যবস্থার প্রসঙ্গই এবার আমেরিকার নির্বাচনী রাজনীতিতে টেনে এনেছেন ট্রাম্প। তাঁর লক্ষ্য ‘Safeguard American Voter Eligibility Act’, সংক্ষেপে SAVE America Act। প্রস্তাবিত এই আইনে ফেডারেল নির্বাচনে ভোটার হিসেবে রেজিস্ট্রেশনের সময় মার্কিন নাগরিকত্বের নথিভিত্তিক প্রমাণ এবং ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সচিত্র পরিচয়পত্রের প্রয়োজনীয়তা আরও কঠোর করার কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকদের যুক্তি, নির্বাচনী ব্যবস্থায় নাগরিকত্ব যাচাই এবং পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতা বাড়ানো হলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। হোয়াইট হাউসও এই আইনকে নির্বাচনী সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে।

SAVE America Act নিয়ে আমেরিকার রাজনৈতিক বিভাজনও তীব্র। রিপাবলিকানদের একাংশের দাবি, শুধু মার্কিন নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এবং নির্বাচনী অনিয়ম ঠেকাতে নাগরিকত্বের প্রমাণ ও ফটো আইডি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা আশঙ্কা করছেন, নতুন নথিপত্রের শর্ত অনেক বৈধ ভোটারের জন্য ভোট দেওয়ার পথে অতিরিক্ত বাধা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের কাছে পাসপোর্ট, জন্মের শংসাপত্র বা প্রয়োজনীয় নাগরিকত্বের নথি নেই, তাঁদের ভোটাধিকার কার্যত সমস্যার মুখে পড়তে পারে বলে বিরোধীদের অভিযোগ।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল SAVE America Act এখনও আমেরিকার আইন হয়ে যায়নি। ২০২৬ সালের গোড়ায় বিলটি নিয়ে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে অগ্রগতি হলেও সেনেটে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়া যায়নি। আগস্টের প্রথম সপ্তাহেও ট্রাম্প প্রশাসন বিলটি পাশ করানোর জন্য প্রবল চাপ তৈরি করেছিল। কিন্তু সেনেট আইনটি পাশ না করেই গ্রীষ্মকালীন অবকাশে চলে যায়। ফলে ট্রাম্পের এখনই SAVE America Act পাশ করতে হবে। এই আহ্বান আপাতত রাজনৈতিক চাপ হিসেবেই রয়েছে আইন হিসেবে তা কার্যকর হয়নি।

এখানেই উঠে আসছে ভারতের এসআইআর প্রসঙ্গ। ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে এসআইআর মূলত ভোটার তালিকার নিবিড় পুনর্বিবেচনা ও যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে SAVE America Act-এর মূল লক্ষ্য ভোটার রেজিস্ট্রেশনের সময় নাগরিকত্বের প্রমাণ এবং ভোটদানের সময় পরিচয়পত্রের শর্ত কঠোর করা। তাই দুটিকে একেবারে একই ব্যবস্থা বলা ঠিক হবে না। ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব এবং পরিচয় যাচাইকে কেন্দ্র করে দুই দেশেই যে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে, সেই জায়গা থেকেই ভারতের ধাঁচে আমেরিকাতেও কি কড়াকড়ি?এই প্রশ্নটি সামনে আসছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে জ্ঞানেশ কুমারের নাম উঠে আসার ঘটনাটিও তাই আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে দেশে রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যখন ভারতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে নিজের দেশে আইন পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, তখন বিষয়টি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে সমর্থন করে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সের্গিও গোরও ভারতের ভোটার পরিচয় যাচাই ব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন এবং SAVE America Act পাশ করার পক্ষে সওয়াল করেছেন।

আর এই গোটা বিষয় সামনে আসতেই তীব্র কটাক্ষ করেছে কংগ্রেস। কংগ্রেস সদস্য পবন খেরার বলেন, প্রিয় ডোনাল্ড ট্রাম্প। দয়া করে জ্ঞানেশ কুমার গুপ্তকে আমেরিকায় নিয়ে যান এবং ওখানেই রেখে দিন।

এই গোটা বিতর্কের আসল প্রশ্ন শুধু ভারত বনাম আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থার তুলনা নয়। প্রশ্ন হল, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই কতটা কঠোর হওয়া উচিত। আর সেই কড়াকড়ির কারণে কোনও বৈধ নাগরিক যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তার ভারসাম্য কোথায়? ভারত নিজের মতো করে এই ব্যবস্থার প্রয়োগ করছে। আমেরিকাও নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সেই পথ খুঁজছে। ফলে জ্ঞানেশ কুমারের নাম করে ট্রাম্পের মন্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক পোস্টে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তা ফের সামনে নিয়ে এসেছে ভোটার তালিকা, পরিচয়পত্র, নাগরিকত্ব এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের পুরনো বিতর্ক। আর সেই বিতর্ক এখন ভারত ছাড়িয়ে ট্রাম্পের দেশেও।