শান্তি বৈঠকে যোগ দিতে পাকিস্তানে ট্রাম্প ?

ট্রাম্পের এই বক্তব্যে স্পষ্ট তিনি চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে চাইছেন।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ। সাময়িক যুদ্ধবিরতির মাঝেই নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী বুধবারের মধ্যে যদি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে কোনও শান্তিচুক্তি না হয় তাহলে তেহরানে আবারও বোমাবর্ষণ শুরু করতে পারে মার্কিন বায়ুসেনা। তাঁর এই মন্তব্য শুধু কূটনৈতিক মহলেই নয় গোটা বিশ্বের নজর পশ্চিম এশিয়ার দিকেই রয়েছে। কারণ এই সংঘাতের আগুন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না তার প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, জ্বালানি ও বিশ্ব নিরাপত্তার উপরও। শুক্রবার অ্যারিজোনা থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েই ট্রাম্প এই কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আর বাড়ানোর কোনও ইচ্ছে তাঁর নেই। ইরানের উপর যে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি হয়েছে তা বজায় থাকবে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনও ইতিবাচক ফল না আসে তাহলে আমেরিকা আবারও আক্রমণাত্মক পথে হাঁটবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে স্পষ্ট তিনি চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে চাইছেন। তবে এই কৌশলে কতটা সফল হবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্য়ে মতভেদ রয়েছে।

আগামী ২১ এপ্রিল শেষ হচ্ছে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ। তার ঠিকে আগের দিন অর্থাৎ ২০ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে হতে চলেছে দ্বিতীয় দফার শান্তি বৈঠক। জানা গিয়েছে, রবিবারই দুই দেশের প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে পৌঁছে যাবে। এই বৈঠককে কেন্দ্র করে এখন কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে। কারণ, এর আগেও গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদেই প্রথম দফার আলোচনা হয়েছিল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে দীর্ঘ বৈঠক করলেও কোনও চূড়ান্ত সমাধান বের হয়নি। ফলে দ্বিতীয় দফার আলোচনা ঘিরে প্রত্যাশা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ব্যর্থতার আশঙ্কাও। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ ছিল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী। এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। প্রণালী বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় ও বহু দেশ সংকটে পড়ে। শুক্রবার ইরান ঘোষণা করে সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হচ্ছে। এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল অন্যরকম। তিনি প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইরানকে ধন্যবাদ জানান। কিন্তু পরে বলেন আমেরিকার অবরোধ ততক্ষণ চলবে যতক্ষণ না শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়। তাঁর এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্পের মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ সরাসরি অভিযোগ করেন, মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প সাতটি মিথ্যা দাবি করেছেন। তাঁর মতে, এই ধরনের বক্তব্য শান্তি আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করছে এবং সমঝোতার পথ আরও কঠিন করে তুলছে। তিনি আরও বলেন, আমেরিকা যদি অবরোধ চালিয়ে যায় তাহলে হরমুজ প্রণালীও পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকবে না। অর্থাৎ ইরানও পাল্টা চাপ তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছে। শান্তি বৈঠকের আগে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। জানা গিয়েছে, ইরান-আমেরিকা সংঘাতের সমাধান নিয়ে তিন দেশের নেতাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কাতার, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই মুহূর্তে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর আগেও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করে শান্তি প্রচেষ্টায় অংশ নিয়েছিলেন।

অবশ্য ট্রাম্প নিজেও জানিয়েছেন যে প্রয়োজন হলে তিনি ইসলামাবাদে যেতে পারেন। তাঁর কথায় যদি কোনও ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয় তাহলে তিনি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন। এই মন্তব্যের পর নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় দফার বৈঠকে কি ট্রাম্প নিজেই মার্কিন প্রতিনিধিত্ব করবেন? অন্যদিকে ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনেই এখনও প্রকাশ্যে আসেননি। ফলে তাঁর তরফে কে প্রতিনিধিত্ব করবেন সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের আলোচনার উপর। যদি এই আলোচনা সফল হয় তাহলে শান্তি ফিরবে। আর যদি আবারও দ্বিতীয় দফার শান্তির আলোচনা ব্যর্থ হয় তাহলে আবারও যুদ্ধ হবে। এখন সময়ই বলবে শান্তি ফিরবে না আবারও যুদ্ধ হবে।