ইরানের এই রণকৌশলে কুপোকাত ট্রাম্প !

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের কাছে  নাকি ১৫ দফা প্রস্তাব পেশ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন! যদিও প্রকাশ্যে এই প্রস্তাবের দাবি করেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা ৫ টি শর্ত আরোপ ইরানের।

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : কোনওভাবেই মাথানত না করার অঙ্গীকার নিয়েছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ থাকার কোনও কারনই নেই। তারপরেও দাবার চালটা কিরকম যেন ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে হরমুজে ৪৮ ঘন্টার ডেডলাইন। ট্রাম্পের সেই ডেডলাইন কোনও পাত্তাই পেল না ইরানের কাছে। যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনা। এমনকি ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার কথা ভুয়ো বলে দাবি করে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে গোটা বিশ্বের কাছে মিথ্যাবাদি প্রমান করল ইরান। তারপরেও কোনও রাগের বহিঃপ্রকাশ না করে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের কাছে  নাকি ১৫ দফা প্রস্তাব পেশ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন! আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে  অন্তত এমন খবরই প্রকাশ্যে আসছে। যদিও প্রকাশ্যে এই প্রস্তাবের দাবি করেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা ৫ টি শর্ত আরোপ করতে সময় নষ্ট করেনি ইরান।

প্রথমে আসা যাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি প্রস্তাবের কথায়। যেহেতু প্রকাশ্যে এই প্রস্তাবের প্রসঙ্গ তোলা হয়নি আমেরিকার তরফে। তাই আর্ন্তজাতির সংবাদমাধ্যম সূত্রে কয়েকটি শর্তই আমরা জানতে পেরেছি।যার মধ্যে প্রথম এবং প্রধান শর্ত হল হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে। একমাসের জন্য যুদ্ধে বিরতি টেনে আনতে হবে।ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরন কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।মজুত ইউরেনিয়াম তৃতীয় পক্ষের হাতে তুলে দেওয়া। ব্যালিস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করতে হবে।ইরানের অস্ত্রভান্ডার সীমিত রাখতে হবে। কত পাল্লা এবং কত পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র রাখা যাবে, তা পরে নির্ধারণ হবে। আত্মরক্ষা ছাড়া আর কোনও কারনে ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। হিজবুল্লা,হামাসের মত আঞ্চলিক সশস্ত্র বাহিনীগুলিকে সাহায্য বন্ধ করতে হবে।নাতান্‌জ়, ইসফাহান এবং ফোরডো— ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিকে ভেঙে ফেলতে হবে। প্রস্তাবে উল্লেখিত সমস্তকিছু যদি ইরানের তরফে মেনে নেওয়া হয় তাহলে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক প্রত্যাহার করা হবে। বেসামরিক পরমানু জ্বালানি উৎপাদনে সাহায্য করা হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব প্রসঙ্গ বিশ্ব রাজনীতির প্রাঙ্গনে বিশেষ আলোচনার জায়গা করে নিয়েছে। এমনিতেই ট্রাম্পের ৫ দিনের যুদ্ধবিরতির  কথা তার ভয়ের বহিঃপ্রকাশ বলে অনেকে মনে করছেন। কিন্তু কথা হলে যে দেশ নিজেকে শক্তিশালী হিসাবে দাবি করে, সে ইরানকে কেনও ভয় পাবে। যুদ্ধের কোন আঁচ শান্তি পোড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনের।যুদ্ধের রসদ যোগানকারী কেনও উঠে পড়ে লেগেছে যুদ্ধ বন্ধ করতে। যে কোনও পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও প্রস্তাবে রাজি না হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই জেদ কোথাও কি ভাবাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনকে।নাকি এটাও যুদ্ধের কোনও চাল?  যদি তা হয়ে থাকে তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি  প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি  যুদ্ধ বন্ধে তাদের পাল্টা ৫ শর্তও তুলে ধরেছে ইরান।চলুন এক ঝলকে শর্তগুলি আপনাদের সামনে তুলে ধরি।

১. অবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সব ধরনের হামলা ও সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে।

২. ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে আর কোনও যুদ্ধ বা হামলা হবে না, এমন কার্যকর করার সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে হবে।

৩. চলমান যুদ্ধে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৪. শুধু ইরানের ভূখণ্ডে নয়, পঃ এশিয়ায় সব ফ্রন্টে এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে।

৫. হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের যে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রতিপক্ষকে প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে ইরানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে শান্তিপূর্ণ আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে অবাস্তব শর্ত দিচ্ছে।” অতীতের বিভিন্ন চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি এও বলেন, এবার আর ‘ফাঁপা আশ্বাস’ বিশ্বাস করা হবে না।

 গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরু করে। এই হামলায় ইরানের প্রাক্তন শীর্ষ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর মৃত্যু হয়েছে। সেদিন থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা শুরু হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যা ইতিবাচক দিকেই এগোচ্ছে। যদিও  ট্রাম্পের এই দাবিকে অস্বীকার করা হয়েছে ইরানের তরফে। একদিকে যৌথ হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতার মৃত্য়ু,ইন্যদিকে চার সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধ ইরানে দেড় হাজারের বেশি সাধারণ নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রক।ঠিকএই পরিস্থিতিতে শক্তিশালী সভ্য দেশের সভ্যতাকেই হাতিয়ার করেছে ইরান। তেল ও জ্বালানি ওপর নির্ভরশীল হওয়া সভ্য সমাজকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে ইরানের হরমুজ প্রণালির নিষেধজ্ঞা। ভারত সহ কিছু দেশের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলেও পুরোপুরি নিশ্চয়তা কোনও দেশকেই দেওয়া হয়নি।আর এই নিয়েই পরিকল্পনাহীন যুদ্ধ করার দোষে অভিযুক্ত হচ্ছেন ট্রাম্প। দেশের বাইরে তো হচ্ছেনই। দেশের অভ্যন্তরেও তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে বিরূপ মনোভাব।

বিশেষজ্ঞমহলের মতে, ঠিক এই জায়গাতেই  রণকৌশলে আমেরিকার মত শক্তিশালী দেশের শীর্ষ প্রশাসনের কপালে  চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে ইরান। তাই সামরিকভাবে ইরানের থেকে শক্তিশালী হয়েও বুদ্ধির চালে নাজেহাল হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের এখন একটাই লক্ষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ – যেভাবেই হোক , হরমুজকে দখলে নেওয়া। মানে সামনে যেমন প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, সূত্রের খবর, হরমুজ প্রণালী সংশ্লিষ্ট ইরানি উপকূল এবং ইরানের রপ্তানি হাব খার্ক দখলে স্থল সেনা পাঠানোর কথা ভাবছে ট্রাম্প প্রশাসন। এককথায় বলা যেতেই পারে ইরানের কৌশলগত পদক্ষেপে ব্যাপক চাপে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এখন দেখার শক্তি আর কৌশলের দাবাখেলায় শেষ চালটা কে দেয়। আপনাদের কি মনে হয়। মতামত তুলে ধরুন কমেন্টবক্সে।