ভেনেজুয়েলায় হামলার আসল কারণ ট্রাম্পের পর্দাফাঁস 

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক: উত্তেজনা চলছিল গত কয়েকমাস ধরেই। শনিবার সকালে যাবতীয় আশঙ্কাকে সত্যি করে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলা আমেরিকার। ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সে দেশ থেকে অপহরণ করে আমেরিকার বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে। মেট্রোপলিটান ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি মাদুরো। কিন্তু কেন এই ক্ষমতা অধিগ্রহণ? দক্ষিণ আমেরিকার দেশের উপর কিসের ক্ষোভ ট্রাম্পের? কেনই বা সস্ত্রীক মাদুরোকে বন্দি করা হল? কেমন ভাবে করা হয়েছিল সেই পরিকল্পনা? কতদিন ধরেই বা করা হয়েছিল সেই পরিকল্পনা ? এই বর্ণনাকে টিভি শোয়ের সঙ্গে কেন তুলনা করলেন ট্রাম্প ? কেনই বা বললেন , বিশ্বের কোনও দেশ যা পারেনি, তিনি সেটা করে দেখিয়েছেন। কী এমন করলেন তিনি ?

কারণ খুঁজতে গেলে তো পৌঁছতে হবে ঘটনার একেবারে গোড়ায়. বা দু তরফের ভাবনা চিন্তার একেবারে শিকড়ে। কেন এই হামলা ? ভেনেজ়ুয়েলা আক্রমণ এবং প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অপহরণের নেপথ্যে অন্য কারণ দেখিয়েছে আমেরিকা। দাবি, ভেনেজ়ুয়েলা থেকে অপরাধীরা অবৈধ ভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করে। তাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য মাদুরোকে সরানো প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া, মাদুরোর বিরুদ্ধে আমেরিকায় মাদক সন্ত্রাস চালানোর অভিযোগও তুলেছেন ট্রাম্প। আমেরিকার অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানান, আমেরিকার আদালতে বিচারের আওতায় আনা হবে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে।

তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির চক্রান্ত, মেশিনগান ও অন্যান্য ধ্বংসাত্মক যন্ত্র সঙ্গে রাখার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন. তিনি আগেও বারবার অভিযোগ তুলেছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আসলে মাদক কারবারিদের সর্দার। সাবধান করেছিলেন. কিন্তু সেই সাবধানতা বাণীর পরেও তিনি কর্ণপাত করেননি। তাই একেবারে কড়া হাতে লাঠি নিয়ে মাঠে নেমেছেন বলে দাবি ট্রাম্প। কিন্তু আদতে কী শুধুই এই কারণ? নাকি অন্য কিছু। কারণ কি গভীর জলের মাছের মতো সুপ্তো অবস্থায় রয়েছে। তা জানতে হলে প্রথমেই যেদিকে লক্ষ দিতে হবে তা হল ভেনেজুয়েলা। ঠিক কী কী সম্পদ রয়েছে এই ভেনেজুয়েলায়।

আসলে বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ তেলের ভাণ্ডার হল ভেনেজুয়েলা। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে দৈনিক প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদিত হয়। ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার পরেও এর উৎপাদন চমকে দেওয়ার মতো। এখানে তেলের মজুত রয়েছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল যা সৌদি আরবের চেয়েও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার লোভাতুর নজর রয়েছে এই দেশে। রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমেরিকা নিজেদের জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভেনেজুয়েলায় নিজেদের পছন্দের লোক চান ট্রাম্প। ঠিক এই জায়গাতে দাঁড়িয়েই বিশেষজ্ঞদের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আসলে আমেরিকার অজুহাত। আসলে ট্রাম্পের নজর বিশ্বের অন্যতম বড় তৈলখনির দিকে।

একনজরে দেখে নেওয়া যাক, গত কয়েক মাসের ঘটনা পর্যায়ক্রম-
কয়েক মাসের ঘটনাক্রম

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ ট্রাম্পের
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে সেনা মোতায়েন করা হয়
মাদক পাচারের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার নৌকাগুলিকে নিশানায় মার্কিন ফৌজ
গত মাসে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধের নির্দেশ দেন ট্রাম্প
ভেনেজুয়েলায় তেল ট্যাঙ্কার চলাচলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়
মাদক পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি ২০২৪ সালে নির্বাচনে জিতে
প্রেসিডেন্ট হওয়া মাদুরোকে স্বীকৃতি দেয়নি আমেরিকা
ট্রাম্পের অভিযোগ ভেনেজুয়েলার জনগণ দুর্দশাগ্রস্ত

আপাতদৃষ্টিতে গণতন্ত্র ও মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ বলে আমেরিকা দাবি করলেও বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই নেপথ্যে রয়েছে বিরাট রাজনৈতিক কৌশল ও বিরাট খনিজ সম্পদে থাবা বসানোর গভীর ষড়যন্ত্র। কিন্তু বামপন্থী নেতা মাদুরো আমেরিকার অঙ্গুলিহেলনে হাঁটার লোক নন। ক্ষমতায় আসার পরই চিন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান তিনি। এই ঘটনা আমেরিকার জন্য সিঁদুরে মেঘ। অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার সম্পদ কুক্ষিগত করার লক্ষ্যেই আসলে এই হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলার তরফেও দাবি করা হয়েছে, লক্ষ্য যদি মাদক বন্ধ হয়, তাহলে তেলের ট্যাঙ্কারগুলিকে কেন টার্গেট করছে আমেরিকা?

গত কয়েক মাসে পরিস্থিতি এমনিতে ঠান্ডা লড়াইয়ের মতো ছিল। তারই মাঝে শুক্রবার গভীর রাতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপ অতিক্রম করে প্রাসাদে ঢুকে শোয়ার ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। রুদ্ধশ্বাস’ সেই অভিযানের বর্ণনা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বললেন, ঠিক যেন টিভি শোয়ের মতো।

ট্রাম্প বলেন
আমেরিকা যা অর্জন করেছে, বিশ্বের কোনও দেশ তা পারেনি
অল্প সময়ের মধ্যেই ভেনেজ়ুয়েলার সামরিক ক্ষমতা শক্তিহীন হয়ে পড়ে
কারণ আমাদের সেনাবাহিনী এবং আইন সংস্থাগুলি রাতের অন্ধকারে
মাদুরোকে সফল ভাবে ধরে ফেলেছিল, ভয়ঙ্কর অভিযান ছিল এটি
চার দিন ধরে এই অভিযানের জন্য সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম

আমেরিকার স্থানীয় সময় অনুযায়ী ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে মাদুরোর আটক হওয়ার খবর জানান ট্রাম্প। মূল অভিযান হয় তারও আগে। অভিযানের দায়িত্বে ছিল এফবিআই-এর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দল। এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজ়ুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেসকে আপাতত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিয়োগ করল সে দেশের আদালত। ভেনেজ়ুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট এই নির্দেশ দিয়েছে। ক্ষমতা পেয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কড়া বার্তা দেন ডেলসি। অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।