বারুইপুরের মল্লিকপুরে ধরা পড়ল ২ বাংলাদেশি, হরিহরপুরে আটক আরও এক বাংলাদেশি মহিলা।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: বারুইপুরের মল্লিকপুরে ধরা পড়ল ২ বাংলাদেশি, হরিহরপুরে আটক আরও এক বাংলাদেশি মহিলা,আধার কার্ডের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগে চাঞ্চল্য
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ফের বাংলাদেশি নাগরিক আটককে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বারুইপুরের মল্লিকপুর এলাকা থেকে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। একই দিনে হরিহরপুরের বেনিয়াডাঙা এলাকা থেকেও এক বাংলাদেশি মহিলাকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তবে বারুইপুরের ঘটনায় আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ধৃত এক বাংলাদেশি মহিলার বিস্ফোরক অভিযোগকে কেন্দ্র করে। তাঁর দাবি, স্থানীয় এক তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য আধার কার্ড বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। যদিও টাকা নেওয়ার পরও সেই কাজ হয়নি বলে অভিযোগ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বারুইপুর থানার মল্লিকপুর ফাঁড়ির পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে এলাকায় অভিযান চালায়। সেই অভিযানে আটক করা হয় দুই বাংলাদেশি নাগরিককে। ধৃতদের নাম সফিকুল ইসলাম মোল্লা এবং তাঁর স্ত্রী মনিরা বেগম। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, তাঁদের বাড়ি বাংলাদেশের যশোর জেলার মণিরামপুর থানার নেংগুর বাজার পোস্ট অফিসের অন্তর্গত চালুহাটি গ্রামে।
তদন্তকারীদের দাবি, সীমান্তে সক্রিয় দালালচক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন ওই দম্পতি। সীমান্ত পার হওয়ার পর তাঁরা দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর থানার মল্লিকপুর এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। স্থানীয়ভাবে তাঁরা কীভাবে থাকতেন, কোথায় কাজ করতেন এবং কতদিন ধরে ওই এলাকায় ছিলেন, তা নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
পুলিশের একাংশের অনুমান, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশের পর স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সহযোগিতায় তাঁরা এলাকায় স্থায়ীভাবে থাকার চেষ্টা করছিলেন। এমনকি ভারতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের ভারতে প্রবেশের উদ্দেশ্য, দালালচক্রের ভূমিকা এবং স্থানীয় যোগাযোগের খোঁজ চালানো হচ্ছে।
তবে পুরো ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে মনিরা বেগমের অভিযোগ। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তিনি দাবি করেন, পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করার জন্যযে তাঁরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দ্বারস্থ হয়েছিলেন। মনিরার অভিযোগ, বারুইপুর পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের মল্লিকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল কংগ্রেস সদস্য শাজাহান সরদার আধার কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলেন।
মনিরা বেগমের দাবি, স্থানীয়ভাবে বসবাস করতে গেলে পরিচয়পত্র প্রয়োজন হয়। সেই কারণেই তাঁরা আধার কার্ড বানানোর জন্য যোগাযোগ করেন। অভিযোগ, শাজাহান সরদার আধার কার্ড করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নিলেও পরে আর কোনও কাজ হয়নি। একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি বলে দাবি তাঁর। বর্তমানে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তিনি অভিযুক্ত পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
যদিও মনিরার অভিযোগের সত্যতা এখনও সরকারি ভাবে যাচাই হয়নি। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত মহিলার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এখনও পর্যন্ত তাঁর প্রতিক্রিয়া মেলেনি। ফলে অভিযোগের পাল্টা বক্তব্যও সামনে আসেনি।
এদিকে, একই দিনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার হরিহরপুর এলাকার বেনিয়াডাঙা থেকেও এক বাংলাদেশি মহিলাকে আটক করেছে পুলিশ। আটক মহিলার নাম লাকিন তাতি (৩৯)। তাঁর স্বামীর নাম জিয়ারুর রহমান তাতি। তিনি কীভাবে ভারতে এসেছিলেন এবং কতদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছিলেন, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তাঁর কাছে কোনও বৈধ নথিপত্র ছিল কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন অংশে গোপন সূত্রে খবরের ভিত্তিতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের একাংশের মতে, সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় দালালচক্রের মাধ্যমেই বহু বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে প্রবেশ করে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা পরিচয় গোপন করে দীর্ঘদিন বসবাসও করছেন বলে অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে বারুইপুর ও হরিহরপুরে পরপর বাংলাদেশি নাগরিক আটক হওয়ায় প্রশাসনিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, আধার কার্ড তৈরির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। কারণ, কোনও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী যদি স্থানীয়ভাবে পরিচয়পত্র পেয়ে যায়, তাহলে তা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাপানউতোর শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে অনুপ্রবেশ রুখতে প্রশাসন যথেষ্ট সক্রিয় নয়। পাশাপাশি, স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক মদত ছাড়া এ ধরনের ঘটনা সম্ভব নয় বলেও অভিযোগ উঠছে। যদিও এই বিষয়ে শাসকদলের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি।
মঙ্গলবার গভীর রাতে সফিকুল ইসলাম মোল্লা ও মনিরা বেগমকে বারুইপুরের হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে, হরিহরপুর থেকে আটক লাকিন তাতিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ এখন তদন্ত করে জানতে চাইছে, এই তিনজনের মধ্যে কোনও যোগাযোগ ছিল কি না, অথবা একই দালালচক্রের মাধ্যমে তাঁরা ভারতে এসেছিলেন কি না।
সমগ্র ঘটনায় এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে— কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে তাঁরা এ দেশে ঢুকলেন? কারা তাঁদের আশ্রয় দিল? স্থানীয়ভাবে পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টা হয়েছিল কি? আর আধার কার্ডের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগে আদৌ কোনও সত্যতা রয়েছে কি না? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তে নেমেছে পুলিশ। এখন তদন্তের অগ্রগতির দিকেই নজর প্রশাসন, রাজনৈতিক মহল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের।