শারীরিক প্রতবন্ধকতা নিয়ে ৯৯% কাজ সারলেন দুই BLO

কাজের চাপ, মানসিক চাপে যখন অসুস্থ বহু বিএলও, তখন শারীরিক প্রতবন্ধকতা নিয়ে ৯৯% কাজ সেরে নজির গড়লেন দুই BLO

সত্যজিৎ চক্রবর্তী ও মিলন কর্মকার, নিজস্ব সংবাদদাতা :  এসআইআর চালু হওয়ার পর থেকে সাধারণ ভোটাররা যেমন চিন্তায়, তেমনই নাওয়া খাওয়া লাটে উঠেছে বিএলওদেরও। কাজের চাপে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অভিযোগ কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছেন। মানসিক চাপে কারও আবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে। এ রাজ্যে এসআইআর চালু হতেই এইসব নানান ছবি ধরা পড়েছে। এইসব ছবির মাঝেও কেউ কেউ কাজ করে যাচ্ছেন নীরবে। আজ এমনই দুজন বিএলওর ছবি তুলে ধরব, যারা শারীরিক প্রতবন্ধকতা কাটিয়ে ৯৯ শতাংশ কাজ সেরে ফেলেছেন। কেউ এক পা নিয়েই বাড়ি বাড়ি ঘুরেছেন, তো কেউ পায়ে প্লাস্টার নিয়ে বাড়িতে বসেই কাজ সারছেন।

জন্ম থেকে এক পা নেই। অপর পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে নিজের এলাকার এসআইআরএর কাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ সেরে ফেললেন বিশেষভাবে সক্ষম আইসিডিএস কর্মী শোভানারা বায়েন। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর ব্লকের বেলশুলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের জামশুলি গ্রামের বাসিন্দা শোভানারা বায়েন। জন্ম থেকেই তাঁর একটি পা হাঁটুর নীচ থেকে নেই। শারিরীক এই প্রতিবন্ধকতা দমিয়ে রাখতে পারেনি শোভানারাকে। নিজের মনের অদম্য জেদে লেখাপড়া করে স্নাতকোত্তর ও বিএড সেরে ফেলেছেন শোভানারা। তারপর গ্রামেই এখন আইসিডিএস কর্মী হিসাবে কাজ করেন। সম্প্রতি বিএলও হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। শারীরিক সমস্যার কথা জানিয়ে শোভানারা প্রথমে এই কাজ থেকে অব্যাহতি চাইলেও প্রশাসনিকভাবে তেমন উদ্যোগ চোখে না পড়ায় আর আপত্তি জানাননি। রাজ্য জুড়ে  এস আই আর এর কাজ শুরু হতেই কোমর বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েনে শোভানারা। দায়িত্ব পাওয়া নিজের গ্রাম জামশুলির ২৩৮ নম্বর বুথের ১০৩৯ জন ভোটারের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এস আই আর এর ফর্ম বিতরণ করেন তিনি। একদিকে গ্রামের আইসিডিএস কেন্দ্রে নিয়মিত কাজ সেরে এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফর্ম সংগ্রহের কাজও শুরু হয় কনিশনের বিধি মেনে। সকাল থেকে টানা কাজ করে বিকালে বাড়িতে ফিরে শুরু হয় ফর্মের তথ্য কমিশনের নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোডের কাজ। গভীর রাত পর্যন্ত চলে সেই কাজ।  আর এভাবেই লাগাতার কাজ করে ইতিমধ্যেই এলাকার ৯৯ শতাংশ ভোটারের কাছ থেকে গননা ফর্ম সংগ্রহ করে তা কমিশনের নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করে ফেলেছেন শোভানারা।

এসআইআর-এর কাজের চাপে যেখানে সুস্থ স্বাভাবিক বিএলও রা যেখানে দিশেহারা সেখানে শোভানারার এমন কৃতিত্ব রীতিমত প্রশংসা কুড়িয়েছে প্রশাসনের। তবে শারিরীক প্রতিবন্ধকতার মতোই এক্ষেত্রেও কোনো অজুহাত বা প্রশংসার তোয়াক্কা না করেই বাকি কাজটুকু দ্রুত সেরে ফেলতে এখন এক পায়েই লাফিয়ে লাফিয়ে ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন শোভানারা। শোভানারার এমন কাজে অনুপ্রানিত আশপাশের বিএলও ও স্থানীয় ভোটাররাও।

শুধু শোভানারা নয় উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর ১০১ নম্বর বিধানসভার মানিকতলা এলাকায় ২৭০ নম্বর বুথের BLO চিরঞ্জীব মজুমদার SIR-এর কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে ডান পা ভেঙে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাডিশনাল BLO শ্যামল বড়াল তাঁকে হাবড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। এক্স–রে ও প্লাস্টার শেষে আবার বাড়ি ফিরেই ভাঙ্গা পা বালিশের উপর তুলে শুরু করেন SIR-এর ফর্ম আপলোডের কাজ। চিরঞ্জীব বাবু ক্যামেরার সামনে জানান টানা কয়েকদিন রাতজেগে কাজের চাপেই এমন দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে বুথের জটিলতা, ফর্ম আপলোডের বাড়তি চাপ। তাও কাজ থেকে অব্যাহতি নেননি তিনি। বাড়িতে বসেই কাজ করে চলেছেন।

বিএলওর ভাঙা পা নিয়ে কাজ করার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর বাড়িতে ছুটে আসেন অশোক নগরের তৃণমূল বিধায়ক নারায়ণ গোস্বামী। ২৭০ নম্বর বুথে ১৩ শোর উপর ভোটার। অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করছেন বিএলও চিরঞ্জীব মজুমদার। যা দেখে হতবাক বিধায়কও।

বিওএলও পোর্টালে সমস্যা রয়েছে। তার উপর নির্দিষ্ট সময়ে ডিজিটালাইজেশনের কাজ শেষ করতে হবে। হাতে সময় কম। তাই এসাইআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে কোনওরকম ভাবে অবহেলা করতে নারাজ শোভানারা ও চিরঞ্জিব বাবুরা। তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন এভাবেও দায়িত্ব পালন করা যায়।