বহিরাগত প্রার্থী মানছি না, মানবো না, ভূমিপুত্র চাই এই স্লোগানে ছেয়ে যায় পোস্টার। স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের একাংশের দাবি আবু তাহের মহম্মদ আব্দুল্লাহকে প্রার্থী করা হোক।

শ্যাম বিশ্বাস, নিজস্ব সংবাদদাতা : বসিরহাট উত্তরের রাজনীতির আকাশে যেন অন্যই মেঘ। এবার তৃণমূলের বসিরহাট উত্তরের প্রার্থী তৌসিফুর রহমান। এই কেন্দ্র থেকে তাঁকেই ভরসা করেছে দল। কিন্তু প্রার্থী ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা নিছক রাজনৈতিক লড়াইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে ক্ষোভ ও দলীয় টানাপোড়েনের সমীকরণে। রাজনৈতিক মহলের মতে, তৌসিফুর রহমানের নাম ঘোষণার পর থেকেই বসিরহাট উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র যেন দুই মেরুর মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েছে। একদিকে দলীয় নেতৃত্বের আস্থা অন্যদিকে কর্মী সমর্থকদের একাংশের অসন্তোষ। প্রার্থী হিসেবে তৌসিফুর রহমানকে সামনে আনতেই এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যায় বিক্ষোভের চিত্র। বহিরাগত প্রার্থী মানছি না, মানবো না, ভূমিপুত্র চাই এই স্লোগানে ছেয়ে যায় পোস্টার। স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের একাংশ সরাসরি দাবি তোলেন যে, এই কেন্দ্রের প্রার্থী হওয়া উচিত আবু তাহের মহম্মদ আব্দুল্লাহর। তাঁদের অভিযোগ, তৌসিফুর রহমান স্থানীয় নন, তাঁর বসবাস কলকাতায়। ফলে এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি কিছু কর্মী-সমর্থকের তরফে হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দেওয়া হয় প্রার্থী এলাকায় প্রচারে এলে তাঁকে বাধা দেওয়া হবে।
এই বিতর্কের মাঝেই নিজের অবস্থান মজবুত করতে এবং সংগঠনকে একত্রিত করার লক্ষ্যে তৌসিফুর রহমান নামেন ময়দানে। বসিরহাট উত্তরের মুরারীশাহ এলাকায় একটি কর্মীসভায় তিনি উপস্থিত হন। যেখানে তাঁর পাশে ছিলেন দলের দুই অভিজ্ঞ প্রাক্তন বিধায়ক। এটিএম আব্দুল্লাহ রনি এবং রফিকুল ইসলাম মণ্ডল। এই সভা নিছক একটি সাংগঠনিক বৈঠক ছিল না। বরং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামার কৌশল যে সুপরিকল্পিত তা এই সভা থেকেই স্পষ্ট হয়। কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ও উচ্ছাসও প্রমাণ করে দলের ভিত এখনও যথেষ্ট দৃঢ় এবং তারে আরও চাঙ্গা করার চেষ্টা চলছে। সভামঞ্চ থেকে তৌসিফুর রহমান ঐক্যের বার্তা দেন। তিনি বলেন, এই লড়াই শুধুমাত্র একটি নির্বাচনের লড়াই নয়। এটি মানুষের আস্থা জয়ের লড়াই। বিরোধীদের ভ্রান্ত প্রচারের মোকাবিলা করতে গেলে আমাদের সংগঠনের প্রতিটি স্তরে সমন্বয় জরুরি। তাঁর বক্তব্যে উন্নয়নের বার্তা যেমন ছিল তেমনই ছিল কর্মীদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান। অন্যদিকে, প্রাক্তন বিধায়করা তাঁদের অভিজ্ঞতার আলোকে বোঝান ভোটের আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে বুথ স্তরের সংগঠনে। ঘরে ঘরে পৌঁছে মানুষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার ওপরই জোর দেন তাঁরা।
এই কর্মীসভায় উপস্থিত ছিলেন হাসনাবাগ ২ ব্লক তৃণমূল সভাপতি এস্কেন্দার গাজি, যুব তৃণমূলের ব্লক সভাপতি আসলাম গাজি-সহ একাধিক স্থানীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধি। তাঁদের উপস্থিতি শুধু সভার গুরুত্বই বাড়ায়নি বরং একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। দল এই কেন্দ্রকে কোনওভাবেই হালকাভাবে নিচ্ছে না। বরং নির্বাচনের আগে একাধিক ছোট, বড় কর্মিসভা করে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে বসিরহাট উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র এখন এক অদ্ভূত দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বিতর্ক, অসন্তোষ ও রাজনৈতিক চাপানউতোর। অন্যদিকে, সংগঠনের শক্তি ও জয়ের লক্ষ্যে একত্রিত হওয়ার প্রচেষ্টা। এই টানাপোড়েনই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে তা নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট উত্তর কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল তৃণমূলের পক্ষে। তৃণমূল প্রার্থী রফিকুল ইসলাম মণ্ডল ৮৯,৩৫১ ভোটে জয়ী হন। এই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোট বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে যার অধিকাংশ তৃণমূলের দিকে গেলেও একটি অংশ আইএসএফের দিকে সরে যায়। এখানে বিজেপি তৃতীয় স্থানে থাকে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই। বিতর্কের ঘূর্ণাবর্ত পেরিয়ে কি তৌসিফুর রহমান নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবেন? নাকি এই অন্দরের অশান্তিই হয়ে উঠবে তাঁর সবচেয়ে বড় বাধা? এই উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত বসিরহাট উত্তরের এই নির্বাচন শুধুমাত্র একটি আসনের লড়াই নয় এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক কৌশল ও সংগঠনের এক জটিল পরীক্ষা। যার ফালফলের দিকে তাকিয়ে থাকবে গোটা রাজ্য।