ইরানের দাবি- “সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং এই যুদ্ধের ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আমেরিকাকে।”

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশে হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে বারুদের গন্ধ একটু হালকা হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ঝড় কেটে গেছে। যুদ্ধের উত্তাপ এখনও কমেনি, শুধু সাময়িকভাবে তার শিখা একটু কমেছে। ঠিক এই আবহেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করলেন ইরানের উপর আপাতত নতুন করে কোনও হামলা চালাবে না আমেরিকা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি অবশেষে সংঘাতের অবসান? উত্তরটা কিন্তু এত সহজ নয়। যুদ্ধ থামেনি, থেমেছে কেবল আক্রমণের তীব্রতা। একটি স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতির আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় অনিশ্চয়তা। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ট্রুথ সোশ্যাল-এ পরপর দুটি পোস্ট করে ট্রাম্প জানান, গত দুদিন ধরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে গঠনমূলক ও ইতিবাচক আলোচনা চলছে। সেই দাবির ভিত্তিতেই তিনি ঘোষণা করেন পাঁচ দিনের জন্য ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে কোনও ধরনের হামলা চালানো হবে না। অর্থাৎ আগে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার চরম হুঁশিয়ারি কিছুচা শিথিল করে সময় বাড়ালেন তিনি। তবে একইসঙ্গে স্পষ্ট বার্তাও দিয়ে রাখলেন এই বিরতি একেবারেই সাময়িক। যদি আলোচনার পথ ভেঙে যায় বা তেহরান নতুন করে আঘাত হানে তাহলে আমেরিকার প্রতিক্রিয়া হবে কঠোর ও নির্দয়।

কিন্তু এই ঘোষণার পরই ছবিটা অন্য দিকে মোড় নেয়। ইরান সরাসরি ট্রাম্পের দাবিকে অস্বীকার করে জানিয়ে দেয় যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের কোনও আলোচনাই হয়নি। তেহরানের অভিযোগ, এই ধরনের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের মতে, বর্তমান জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতেই আমেরিকা ও ইজরায়েল এই ধরনের খবর ছড়াচ্ছে। শুধু তাই নয় আন্তর্জাতিক বাজার বিশেষত তেলের দামে প্রভাব ফেলতেই এই মনগড়া বার্তা ব্যবহার করা হচ্ছে বলেো অভিযোগ ইরানের। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমে যায় যা এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। অন্যদিকে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে সংঘাত থামানোর কোনও ইচ্ছা তাদের নেই। বরং তারা শর্তের তালিকা সামনে রেখেছে। ইরানের দাবি সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং এই যুদ্ধের ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আমেরিকাকে। যতদিন না এই দাবিগুলি পূরণ হচ্ছে ততদিন এই যুদ্ধ চলবে। এই বার্তাই দিয়েছে তারা। ফলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার মধ্যেও যে স্থায়ী শান্তির কোনও ইঙ্গিত নেই তা স্পষ্ট।
প্রায় এক মাস ধরে চলা এই সংঘাত ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলেছে। কোথাও জ্বালানি সংকট, কোথাও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ যেন ধীরে ধীরে গোটা পৃথিবীকেই গ্রাস করছে। আর এই পরিস্থিতির সূত্রপাত নিয়ে নিজের দায় এড়াতে গিয়ে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই। এক বৈঠকে তিনি সরাসরি মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের দিকে আঙুল তুলে বলেন, ইরানে হামলার প্রস্তাব প্রথম তিনিই দিয়েছিলেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সংকট তৈরি হওয়ার পর কি তবে দায় এড়াতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট?

মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-সহ অনেকেই নাকি এই সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছিলেন। কেউ মনে করছেন আমেরিকা না থাকলেও ইজরায়েল নিজে থেকেই এই হামলা চালাত। এবার অন্য একাংশের দাবি, ইরানে সম্ভাব্য পরমাণু শক্তি অর্জন ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল। অর্থাৎ এই যুদ্ধের লক্ষ্য কী, কতদিন চলবে বা শেষ কোথায় এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর আজও নেই ওয়াশিংটনের কাছে। এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় যে অভিযানকে একসময় হালকাভাবে পশ্চিম এশিয়ায় কয়েক দিনের সফর বলে মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প, সেটাই এখন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ইরান যে এতটা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে কিংবা পাল্টা আঘাতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার কাঁপিয়ে দেবে সেটা হয়তো কল্পনাও করেনি আমেরিকা। একের পর এক শীর্ষ নেতৃত্ব হারিয়েও ইরানের এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই এই যুদ্ধের দিকে কোনদিকে মোড় নেবে? আপাতত যুদ্ধবিরতির আবরণে যে স্বস্তির ছায়া দেখা যাচ্ছে তা কি সত্যিই শান্তির পূর্বাভাস নাকি আরও বড় ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা? এই যুদ্ধের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি ও ভবিষ্যতের উপরও। ইরান কোনওভাবেই মাথা নত করেনি। একের পর এক আঘাতের পরেও তারা স্পষ্ট জানিয়েছে শর্ত না মানা পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের হঠাৎ সুর বদল অনেকের চোখে কিছুটা ভয়ের ইঙ্গিতও।