যৌন অপরাধে এবার আরও কড়া আদালত!

পাজামার দড়ি টানা বা বুকে হাত দেওয়া ‘ধর্ষণের চেষ্টা’— এলাহাবাদ হাই কোর্টের রায় খারিজ করল সুপ্রিম কোর্ট

মাম্পি রায়, সাংবাদিক :  বুকে হাত দেওয়া কিংবা পাজামার দড়ি খুলে দেওয়ার চেষ্টা— এ ধরনের কাজকে ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ হিসাবেই গণ্য করতে হবে। এলাহাবাদ হাই কোর্টের বিতর্কিত পর্যবেক্ষণ খারিজ করে মঙ্গলবার এমনই স্পষ্ট বার্তা দিল সুপ্রিমকোর্ট (Supreme Court of India)। শীর্ষ আদালতের এই রায় যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলাগুলিতে সংবেদনশীলতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি এনভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ জানায়, কোনও মহিলার শরীরে অনভিপ্রেত স্পর্শ করা বা তার পোশাক খোলার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ করা নিছক ‘যৌন হেনস্থা’ হিসেবে দেখলে চলবে না, পরিস্থিতি ও অভিপ্রায় বিবেচনায় তা ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ হিসেবেও গণ্য হতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, যৌন অপরাধের মামলায় বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সকলেরই আরও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন।

এই মামলার সূত্রপাত ১১ বছরের এক কিশোরীকে ঘিরে। অভিযোগ, দুই যুবক নির্জন কালভার্টে তার পথ আটকায়। তারপর তার বুকে হাত দেয় এবং পাজামার দড়ি খোলার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। নিম্ন আদালত পকসো আইনের ১৮ নম্বর ধারায় (অপরাধের চেষ্টা) এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারার উপধারা প্রয়োগ করে মামলা রুজু করে। কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চে Allahabad High Court রায় দেয়, অভিযোগের ভিত্তিতে ‘ধর্ষণ’ বা ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ ধারা প্রযোজ্য নয়; বরং ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪-বি (পোশাক খুলে ফেলার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ) এবং পকসোর ৯ ও ১০ ধারায় বিচার হওয়া উচিত।

হাইকোর্টের বিচারপতি রামমনোহর নারায়ণ মিশ্রের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টার মামলা প্রমাণ করতে হলে দেখাতে হবে যে ঘটনা প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণের দিকেই এগোচ্ছিল। প্রস্তুতি এবং প্রকৃত প্রচেষ্টার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলেও জানানো হয়। এই মন্তব্য ঘিরেই দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে যখন ‘উই দ্য উইমেন অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি সংগঠন এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আবেদন করে। নির্যাতিতার মা-ও পৃথকভাবে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন। এর আগেই বিচারপতি বিআর গবাই এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহের বেঞ্চ হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে ‘সম্পূর্ণ সংবেদনশীলতার অভাব’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিল এবং বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

চূড়ান্ত শুনানিতে সুপ্রিমকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, নারীর শরীরের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ এবং পোশাক খোলার চেষ্টা— যদি তা যৌন সহিংসতার উদ্দেশ্যে হয়— তবে তাকে হালকাভাবে দেখা যায় না। আদালত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশও দিয়েছে, যাতে যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলায় বিচারের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুপারিশ করা যায়।

এই রায়ের ফলে যৌন অপরাধের সংজ্ঞা ও প্রয়োগ নিয়ে ভবিষ্যতে নিম্ন আদালতগুলির অবস্থান আরও সুস্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে যৌন সহিংসতা যে কোনও পর্যায়ে তুচ্ছ নয় এবং আইনের চোখে তার যথাযথ গুরুত্বপূর্ণ, তাও কার্যত স্পষ্ট করে দিল সুপ্রিমকোর্ট।