ইরানে জোরাল আঘাত হানতে চলেছে আমেরিকা ?

ইউএসএস ত্রিপোলিকে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠিয়েছে আমেরিকা। সেটিতে রয়েছে প্রায় ২৫০০ মেরিন সেনা।

রিয়া দাস. সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যেন আবারও যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। এ এক এমন আগুন যার শিখা শুধু একটি দেশের সীমানায় আটকে নেই বরং ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ভবিষ্যতের উপর। ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ইজরায়েল ও আমেরিকা। একের পর এক ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত, লক্ষ্যভেদী সামরিক অভিযান। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে আসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর। যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। মনে করা হয়েছিল এই আঘাতে হয়তো ভেঙে পড়বে তেহরান। কিন্তু বাস্তব যেন অন্য গল্প বলছে। ইরান হার মানেনি। বরং আরও দৃঢ় বার্তা দিয়েছে যে চাপে পড়লেও তারা নত হবে যতই আমেরিকার তরফে হুমকি আসুক না কেন।

এরই মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইতিমধ্যেই পাঠানা হয়েছে হাজার হাজার সেনা আর সেই সঙ্গে জল্পনাও তৈরি হয়েছে এই কি তবে আসন্ন স্থল অভিযানের পূর্বাভাস? পেন্টাগনের অন্দরে চলছে টানা প্রস্তুতি। ইরানে জোরাল আঘাত হানতে ইউএসএস ত্রিপোলিকে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠিয়েছে আমেরিকা। জানা গিয়েছে, সেটিতে রয়েছে প্রায় ২৫০০ মেরিন সেনা। আর সমুদ্রপথে এগিয়ে এসেছে ভয়ংকর শক্তিধর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি যেন নীরব এক বার্তা, আমরা প্রস্তুত। অন্যদিকে ইরানও পিছিয়ে নেই। প্রতিটি হুমকির জবাবে আরও কঠিন সুরে উঠছে তাদের কণ্ঠ। সেনাপ্রধান আমির হাতামির কড়া সতর্কবার্তা যেন আগুনে ঘি ঢেলেছে। আমাদের মাটিতে প্রবেশ করলে একজনও ফিরবে না। এই এক বাক্যে লুকিয়ে আছে প্রতিরোধ, প্রতিশোধ আর আত্মসম্মানের জেদ। এর আগেই ইরানের ইসলামিক গার্ড কর্পস জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা প্রস্তুত, অপেক্ষায়। এই মুহূর্তে বিশ্ব যেন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে। শেষ সিদ্ধান্ত এখনও অধরা। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে বাড়ছে চাপ, বাড়ছে অনিশ্চয়তা। এটা কি শুধুই শক্তি প্রদর্শন নাকি ইতিহাসের নতুন এক অগ্নিগর্ভের সূচনা। কারণ যুদ্ধ কখনও শুধু সীমান্তে হয় না। তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনে, ভবিষ্যতে। আর ঠিক এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা থেকেই যায়। শান্তির পথ কি এখনও খোলা, নাকি ইতিহাস আবারও রক্তের দাগ নিজের নতুন অধ্যায় লিখতে চলেছে।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে গভীর অভিঘাত এসে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীতে। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু জলপথটিই বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্র। যেখানে দিয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল পাড়ি দেয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। সেই পথই আজ অবরুদ্ধ। যুদ্ধের উত্তাপে কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে এই তৈল ধমনী। তেলের জোগান কমে গিয়ে বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বেড়েছে মূল্যবৃদ্ধি, টালমাটাল হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। এই ক্রমবর্ধমান সংকটের মাঝেই উদ্যোগ নেয় ব্রিটেন। ৬০টি দেশকে নিয়ে ডাকা হয় এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালীকে পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই বৈঠকে ভারতের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি। এই বৈঠকে তাঁর কণ্ঠে ছিল উদ্বেগ ও যুক্তি। তিনি স্পষ্ট করে জানান, ভারতে এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না থাকলেও ক্ষতির ভার বইতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি। উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু এই সংকটকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে।

ভারত জানিয়ে দেয়, হরমুজ প্রণালী শুধু একটি আন্তর্জাতিক জলপথ নয়। গোটা বিশ্বের জন্য তো বটেই হরমুজ ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারতের অর্থনীতির অন্যতম জীবনরেখা। দেশের মোট তেলের প্রায় ৪০ শতাংশ এই পথ দিয়েই আসে। পাশাপাশি বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সার এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহো নির্ভর করে এই রুটের উপর। ফলে এই প্রণালী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শুধু জ্বালানি নয়, কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রেও মারাত্মক প্রভাব পড়বে। ইতিমধ্যেই বাসমতী চাল রপ্তানিতে ধাক্কা লেগেছে, কৃষি উৎপাদন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভারত একটাই বার্তা দিয়েছে, যুদ্ধ কখনও সমাধান নয়। যতই পরিস্থিতি জটিল হোক আলোচনার পথই একমাত্র পথ। কূটনীতির টেবিলেই খুঁজতে হবে সমাধান। কারণ যুদ্ধের আগুনে শেষ পর্যন্ত পুড়ে যায় শুধু সীমান্ত নয়। পুড়ে যায় সেই দেশে থাকা মানুষের ভবিষ্যৎ, অর্থনীতির ভিত আর বিশ্বশান্তির স্বপ্ন।

আজ হরমুজ প্রণালী শুধু একটি ভৌগলিক অবস্থান নয়। এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতার লড়াই, প্রতিরোধের প্রতীক এবং বিশ্বনেতাদের পরীক্ষা। একদিকে যুদ্ধের ধ্বংস অন্যদিকে শান্তির আশঙ্কা। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। প্রশ্ন শুধু একটাই এই অন্ধকারের শেষে কি আলো আছে ? হয়তো আছে কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে সবচেয়ে গভীর অন্ধকারের পরেই আসে নতুন ভোর। আর সেই নতুন ভোরের অপেক্ষাতেই আজ তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।