পেট্রোল-ডিজেলের দাম কতটা বাড়বে ?

যুদ্ধের উত্তেজনার জেরে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম একসময় ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যদিও পরে সেই দাম কমে ৯০ ডলারের নীচে নেমে আসে।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের উত্তাপ এখন শুধু সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বিশ্বে। আর সেই ঢেউ এসে লাগছে ভারতের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও। ইরানকে ঘিরে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সংঘাত এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বড় সংকট। এই সংঘাতের জেরে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বা সেখানে জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হওয়ায় তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সামুদ্রিক পথটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণের রুট। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। যুদ্ধের উত্তেজনার জেরে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম একসময় ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যদিও পরে সেই দাম কমে ৯০ ডলারের নীচে নেমে আসে। তবুও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ভারতের জন্য কেন বড় উদ্বেগ?

ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে। আর সেই বৃদ্ধির মূল ভিত্তি হল জ্বালানি। কিন্তু ভারতের একটি বড় সমস্যা হল- দেশটি জ্বালানির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে আমদানির উপর নির্ভরশীল। ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে। এছাড়া দেশের মোট এলপিজি চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করা হয়। আর তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ক্ষেত্রেও অর্ধেকের বেশি চাহিদা বিদেশ থেকে আসে। এই আমদানির বড় অংশই আসে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরু হলেই ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ব্যবহারকারী দেশ। তাই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সামান্য অস্থিরতাও ভারতের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ভারতের কৌশলগত তেল ভান্ডার

এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ভারত আগে থেকেই কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশে রয়েছে স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা কৌশলগত তেল ভান্ডার। এই ভান্ডারের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৫.৩৩ মিলিয়ন টন। বর্তমানে এই ভান্ডার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তি রয়েছে। এছাড়া ভারত সরকারের হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ২৫০ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য মজুত রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪০০০ কোটি লিটার তেল। এই মজুত দেশের জ্বালানি চাহিদা প্রায় ৭ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত মেটাতে সক্ষম। অর্থাৎ হঠাৎ করে সরবরাহে সমস্যা হলেও তাৎক্ষণিক বড় সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বাড়াচ্ছে ভারত

পশ্চিম এশিয়ায় সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ায় ভারত বিকল্প পথ খুঁজছে। তার মধ্যে অন্যতম হল রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়ানো। ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়াই ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশ। যদিও এই নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চাপ রয়েছে। আমেরিকা জানিয়েছে ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের একটি ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে ভারতের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে- দেশের জ্বালানি প্রয়োজন মেটাতে অন্য দেশের অনুমতির প্রয়োজন নেই।

জ্বালানি কূটনীতি

ভারত গত কয়েক বছরে তার জ্বালানি কূটনীতিও শক্তিশালী করেছে। আগে যেখানে ভারত মাত্র ২৭টি দেশ থেকে তেল কিনত, এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০টি দেশে। এই দেশগুলি ছড়িয়ে রয়েছে ছয়টি মহাদেশে। এর ফলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ এখন আর একমাত্র হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল নয়।

পেট্রোল ডিজেলের দাম বাড়বে?

অনেকেরই প্রশ্ন- এই পরিস্থিতিতে কি ভারতে পেট্রোল বা ডিজেলের দাম বাড়বে? সরকারি সূত্র বলছে আপাতত সেই সম্ভাবনা নেই। সরকারের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন- যদি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ থেকে ১২০ ডলারেও পৌঁছায়, তবুও আপাতত খুচরো দামে বড় কোনও পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের উপর তাৎক্ষণিক চাপ পড়ার সম্ভাবনা কম।

আন্তর্জাতিক সংস্থার আহ্বান প্রত্যাখ্যান

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা আইইএ বা International Energy Agency বিভিন্ন দেশকে তাদের কৌশলগত তেল ভান্ডার থেকে তেল ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ভারত সেই আহ্বান মানতে রাজি হয়নি। সরকারি সূত্রের বক্তব্য- ভারতের কৌশলগত ভান্ডার মূলত জরুরি পরিস্থিতির জন্য। যখন সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে, তখনই এই ভান্ডার ব্যবহার করা হবে। সরকারের কথায়- “India First Policy”* অনুসরণ করা হচ্ছে।

জরুরি পদক্ষেপ

জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ায় সরকার ইতিমধ্যেই বেশ কিছু জরুরি ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রথমত, গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তালিকা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে- এলপিজি উৎপাদন, সিএনজি, পাইপড রান্নার গ্যাস। এরপর দ্বিতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সার উৎপাদন শিল্পকে। তাদের গত ছয় মাসের গড় চাহিদার অন্তত ৭০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে- চা বাগান, শিল্প কারখানা, অন্যান্য উৎপাদন ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রগুলিকে দেওয়া হবে প্রায় ৮০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ।

এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ

দেশে বর্তমানে ৩৩ কোটিরও বেশি এলপিজি গ্রাহক রয়েছে। তাই রান্নার গ্যাসের সরবরাহ যাতে স্বাভাবিক থাকে, সেই জন্য সরকার তেল শোধনাগারগুলিকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। প্রোপেন, বিউটেন সহ বিভিন্ন গ্যাস উপাদান সংগ্রহ করে সেগুলিকে এলপিজি পুলে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই এলপিজি সরবরাহ করা হবে সরকারি সংস্থা- ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, ভারত পেট্রোলিয়াম-এর মাধ্যমে।

বিকল্প এলপিজি সরবরাহ

ভারত এখন বিকল্প এলপিজি সরবরাহের পথও খুঁজছে। এর মধ্যে রয়েছে- আমেরিকা, আলজেরিয়া, নরওয়ে, কানাডা- এই দেশগুলির সঙ্গে ইতিমধ্যেই সরবরাহ চুক্তি করা হয়েছে। যদিও দূরত্ব বেশি হওয়ায় জাহাজ পৌঁছতে সময় লাগছে।

রেস্তোরাঁ ও শিল্পে সমস্যা

গৃহস্থালির জন্য গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় সমস্যায় পড়েছে রেস্তোরাঁ ও শিল্পক্ষেত্র। অনেক জায়গায় কমার্শিয়াল এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ কমে গেছে। বেঙ্গালুরুতে ছোট ও মাঝারি রেস্তোরাঁগুলির একটি বড় অংশ গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মুম্বইতেও।

কালোবাজারির অভিযোগ

কিছু জায়গায় এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে কালোবাজারির অভিযোগও উঠেছে। যেখানে একটি সিলিন্ডারের দাম ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। যদিও সরকার বলছে, এই পরিস্থিতি সাময়িক।

ইলেকট্রিক কুকিং ডিভাইসের চাহিদা বাড়ছে

এই সংকটের প্রভাব পড়েছে ই-কমার্স বাজারেও। অনেক মানুষ এখন বিকল্প হিসেবে ইন্ডাকশন কুকটপ কিনতে শুরু করেছেন। ই-কমার্স সংস্থা ফ্লিপকার্ট জানিয়েছে- গত কয়েক দিনে ইন্ডাকশন কুকটপ বিক্রি চার গুণ বেড়ে গেছে। দিল্লি, কলকাতা ও উত্তরপ্রদেশে চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অ্যামাজনও জানিয়েছে- ইন্ডাকশন কুকটপ বিক্রি ৩০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

কীভাবে কাজ করে ইন্ডাকশন কুকটপ?

ইন্ডাকশন কুকটপে আগুন ব্যবহার করা হয় না। এখানে ব্যবহার করা হয় ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক প্রযুক্তি। একটি কপার কয়েলের মধ্যে দিয়ে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। তার ফলে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। যখন সেই চৌম্বক ক্ষেত্রের উপর ধাতব পাত্র রাখা হয়, তখন পাত্রের ভিতরেই তাপ তৈরি হয়। ফলে খাবার দ্রুত রান্না হয়।

মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে?

অনেকেই ভাবছেন- এই তেলের দাম বাড়ার ফলে কি দেশে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে? অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সংসদে জানিয়েছেন- তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি সাধারণত প্রায় ০.৩০ শতাংশ বাড়ে। তাই আপাতত বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা নেই।

সব মিলিয়ে বলা যায়- পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ভারত যদিও তার কৌশলগত মজুত, বিকল্প সরবরাহ এবং নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে যদি সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে চলে, তাহলে তার প্রভাব ভারতের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে আরও স্পষ্টভাবে পড়তে পারে। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে সরকারও। এখন দেখার- এই সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব কতটা গভীর হয়।