নিট দুর্নীতি রুখতে থালাপতির আইডিয়া!

টিভিকে-র দাবি, চিকিৎসা শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্যগুলোর হাতে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া উচিত।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : নিট প্রবেশিকা পরীক্ষায় দুর্নীতি নিয়ে সরব হলেন তামিলনাড়ুর মুখ্য়মন্ত্রী থালাপতি বিজয়। টিভিকের প্রতিষ্ঠাতা দাবি রেখেছেন নিট বাতিলের। এর পরিবর্তে দিয়েছেন পরামর্শ। এই সমস্তকিছু নিয়ে আজকের ভিডিওয় আলোচনা করব। নিট ও চিকিৎসা প্রবেশিকা সম্পর্কিত কিছু বিষয় আপনাদের কাছে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কিছু ইতিহাস জানা প্রয়োজন। কিছু তথ্য হয়ত আপনাদের জানা,তবে প্রশ্নফাঁসের এই দুর্নীতি বুঝতে গেলে কিছু বিষয় জানাটা ভীষন প্রয়োজন।

এই মূহুর্তে দেশের সবথেকে আলোচিত বিষয় হচ্ছে নিট পরীক্ষায় দুর্নীতি রোধে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিবাদ।যাতে পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের যোগদান ও অনশন জোরাল করেছে প্রতিবাদ কর্মসূচিকে। বিভিন্ন বিরোধী দল সহ বলিউডের কলাকুশলীরা সমর্থন জানিয়েছেন সিজেপিকে। দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভিড় বেড়েছে যন্তরে মন্তরে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সিজেপির সংসদ ভবন অভিযান ঘিরে।পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও।তার কথায় নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস গুরুতর পাপ।জড়িতদের কঠোর শাস্তির কথা বলেন তিনি।এই পরিস্থিতিতে মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’ পুরোপুরি বাতিলের দাবি তুললেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়। টিভিকে-র দাবি, চিকিৎসা শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্যগুলোর হাতে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া উচিত।

ভীষন তাৎপর্যপূর্ণ একটা পয়েন্ট। তবে তার আগে আপনাদের জানাব কি এই নিট UG পরীক্ষা।নিট হলো ভারতে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক স্তরে পড়ার জন্য একমাত্র জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষা। এর পুরো নাম হলো ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট । আনুষ্ঠানিকভাবে এটি প্রথম চালু হয় ২০১৩ সালে। তবে আইনি জটিলতার কারণে তা ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বন্ধ ছিল এবং ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এটি সারা দেশে বাধ্যতামূলক প্রবেশিকা পরীক্ষা হিসেবে স্থায়ীভাবে শুরু হয়।এটি পাশ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভারতের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে এমবিবিএস , বিডিএস এবং আয়ুষ কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকেন। ভারতের ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি এই পরীক্ষা পরিচালনা করে।সাধারণত দ্বাদশ শ্রেণিতে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, এবং জীববিজ্ঞান নিয়ে পাশ করা শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষায় বসতে পারে। এই পরীক্ষাটি মূলত একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির NCERT সিলেবাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এটি একটি অফলাইন মোডের পরীক্ষা যেখানে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞান থেকে মোট ৭২০ নম্বরের প্রশ্ন করা হয়।

প্রশ্ন হল নিটের আগে কীভাবে এই পরীক্ষা নেওয়া হত, কেনই বা নিটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়? নিটের আগে ভারতে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক স্তরে ভর্তির জন্য প্রধান জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষা ছিল নিখিল ভারতীয় প্রাক-মেডিকেল পরীক্ষা বাAIPMT)। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত সর্বভারতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা’টি ১৯৮৮ সালে চালু হয় । সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন বা CBSE এটি পরিচালনা করত। এর মাধ্যমে সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের মোট আসনের ১৫% পূরণ করা হতো। বাকি ৮৫% আসনের জন্য রাজ্য সরকারগুলো আলাদাভাবে নিজস্ব রাজ্য স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষা যেমন- WBJEE, CET ইত্যাদি নিত। এছাড়াও, এইমস বা জিপমার -এর মতো স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পরীক্ষা নিজেরাই পরিচালনা করতো।

AIPMT-এর পরিবর্তে নিট পরীক্ষা চালুর মূল কারণ ছিল চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রক্রিয়াকে আরও সরল, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করা। আগে কেন্দ্রীয় স্তরের জন্য এআইপিএমটি এবং রাজ্যস্তরে ও বিভিন্ন বেসরকারি কলেজের জন্য আলাদা আলাদা প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হতো। এর ফলে একজন শিক্ষার্থীকে প্রায় ১০ থেকে ১৫টি পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে হতো, যা তাদের জন্য অত্যন্ত ক্লান্তিকর ও ব্যয়বহুল ছিল। নিট চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা একটিমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে সমগ্র ভারতে ভর্তির সুযোগ পায়। পূর্বে বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি, অবৈধ অনুদান বা ডোনেশন নেওয়ার অভিযোগ উঠত। নিট চালু হওয়ার পর মেধার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের সমস্ত আসনে কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা হয়, যার ফলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যায় বলে দাবি করা হয় । কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বার বার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ নিটের গ্রহনযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

এবার আপনাদের জানাব থালাপতি বিজয়ের রাজ্য়ভিত্তিক পরীক্ষার ভাবনা কোথা থেকে। এর আগে তামিলনাড়ুর স্ট্যালিন সরকারও এই বিষয়ে সরব হয়েও বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে পারেনি।সেই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পূর্বতন তৃণমূল সরকার, কেরালা এবং দিল্লি সহ অন্যান্য বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলিও জাতীয় স্তরের এই পরীক্ষার ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ‘নিট’ বাতিল করে রাজ্যভিত্তিক মেডিক্যাল প্রবেশিকা ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছে।কথায় বলে না old is gold। আপনারা জানেন AIPMT বা All India Pre-Medical Test-এর আগে কেন্দ্রীয় স্তরে মেডিকেল ভর্তির জন্য PMT বা Pre-Medical Test নামে পরীক্ষা হতো। এছাড়াও, বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষা, যেমন- WBJEE, রাজ্যের PMT এবং AIIMS ও JIPMER-এর মতো স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা প্রবেশিকা পরীক্ষা প্রচলিত ছিল। সারা ভারতে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির জন্য এটি একটি অন্যতম প্রধান পরীক্ষা ছিল, যা সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন CBSE কর্তৃক পরিচালিত হতো। বিভিন্ন রাজ্য নিজ নিজ মেডিকেল কলেজে ৮৫% আসন পূরণের জন্য নিজস্ব পরীক্ষা পরিচালনা করতো, যেমন পশ্চিমবঙ্গে WBJEE Medical। কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন AIIMS বা অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস-এর নিজস্ব এন্ট্রান্স পরীক্ষা ছিল। পরবর্তীতে, সমস্ত রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় পরীক্ষাকে একত্রিত করে NEET UG চালু করা হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে থালাপতির দাবি অনুযায়ী নিট বাতিল হয়ে রাজ্যস্তরে মেডিকেল পরীক্ষা শুরু হলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত দুর্নীতি রোধ করা কতটা সম্ভব?বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় পরীক্ষা যেমন-NEET-এর ক্ষেত্রে, বিশাল পরিধি সামলাতে গিয়ে যে ধরনের বড়োসড়ো প্রশ্নফাঁস বা কারচুপির ঘটনা ঘটেছে, রাজ্যভিত্তিক পরীক্ষা হলে তার সুযোগ কমবে। তবে রাজ্যভিত্তিক পরীক্ষা হলে দুর্নীতি রোধের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার পাশাপাশি রাজ্যস্তরের পরীক্ষাসমূহ পরিচালনার ক্ষেত্রেও অতীতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে মধ্যপ্রদেশের ‘ব্যাপম’ কেলেঙ্কারির মতো বড় দুর্নীতি রাজ্য স্তরের পরীক্ষার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছিল। রাজ্যভিত্তিক আলাদা পরীক্ষা হলে বিভিন্ন বোর্ডের পড়ুয়াদের মূল্যায়নে তারতম্য তৈরি হতে পারে।