আস্থা ভোটে জয়ী বিজয়, ফের বিতর্কে উদয়নিধি !

ক্ষমতার জাদুদণ্ড হাতে পেতেই বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরালেন টিভিকে প্রধান।

শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : ক্ষমতায় এসেছিলেন রাজনীতিতে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আশ্বাস দিয়েছিলেন দিনবদলের। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার বসেই থালাপতি বিজয় আর পাঁচজন সাধারণ রাজনীতিবিদের মতো কাজ শুরু করে দিলেন। ক্ষমতার জাদুদণ্ড হাতে পেতেই বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরালেন টিভিকে প্রধান।
বিজয়ের সরকারকে সমর্থনের প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেল তামিলনাড়ুর অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি তথা দীর্ঘসময়ের শাসকদল এডিএমকে। দলের দুই প্রবীণ নেতা সিভি সম্মুগম এবং এসপি ভেলুমানি ঘোষণা করেন বিধানসভায় আস্থা ভোটে বিজয়ের সরকারকে সমর্থন রয়েছে তাঁদের। তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জয়ললিতার দল এডিএমকে-র ২৫ জন বিধায়ক বিজয়কে সমর্থন করেছেন।
বুধবার আস্থা ভোটে মুখ্যমন্ত্রী বিজয় ১৪৪টি ভোট পেয়ে জেতেন। প্রধান বিরোধী দল ডিএমকে এই ভোটের আগেই ওয়াকআউট করে। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ১৪৪টি, বিপক্ষে পড়ে ২২টি ভোট। পিএমকে এবং বিজেপি এই আস্থা ভোটে নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়।

তামিলনাড়ুর বিধানসভায় ২৩৪টি আসনের মধ্যে ৪৭টিতে জয়ী হয়েছে এডিএমকে। জয়ী বিধায়কদের মধ্যে ৩০ জনকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলের বিধায়ক তথা রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ সিভি সম্মুগম। চেন্নাইয়ে একটি সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি বলেন, ভোটের ফল থেকে স্পষ্ট যে, মানুষ বিজয়কে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চেয়েছিলেন। মানুষের এই রায়কে সমর্থন করছি। একই সঙ্গে সম্মুগম জানান এডিএমকে-র পরিষদীয় দলের তরফ থেকে তাঁরা বিজয়ের সরকারকে সমর্থন করছেন।
নিজের বক্তব্যে এডিএমকে প্রধান তথা তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পালানিস্বামীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেন সম্মুগম। তাঁর দাবি, পালানিস্বামী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দল ডিএমকে-র সঙ্গে জোট করতে চেয়েছিলেন। সম্ভাব্য এই জোটের বিষয়টি দলের নেতা-কর্মীরা ইতিবাচক ভাবে নেননি। তবে পালানিস্বামীকে নিজেদের নেতা হিসাবেই উল্লেখ করেছেন সম্মুগম। তিনি বলেন, এডিএমকে কোনও দলের সঙ্গে জোটে নেই। আমরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছি। পালানিস্বামী আমাদের নেতা। পালানিস্বামী আমাদের সাধারণ সম্পাদক।

সম্মুগমের বক্তব্য থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়নি। এক, দলের বাকি ১৭ জন বিধায়কের অবস্থান কী। মনে করা হচ্ছে ওই বিধায়কেরা পালানিস্বামীর সঙ্গে রয়েছেন এবং তাঁরা টিভিকে সরকারকে সমর্থন করবেন না। দুই, এত দিন এডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোটে ছিল। সম্মুগম কোনও দলের সঙ্গে এডিএমকে জোটে নেই-এই দাবি করার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে ১০৮টি আসনে জয়ী হয়েছে টিভিকে। কংগ্রেস, ভিসিকে, দুই বাম দল সিপিআই এবং সিপিএম-এর সমর্থনে সরকার গড়েছে বিজয়ের দল। অন্য দিকে, এমকে স্ট্যালিনের দল ডিএমকে জিতেছে ৫৯টি আসনে। আর এডিএমকে জিতেছে ৪৭টি আসনে।

২০১৬ সালে তামিলনাড়ুর জনপ্রিয় রাজনীতিক তথা পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার প্রয়াত হওয়ার পর থেকে বারে বারে তাঁর দল ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দল ছেড়েছেন একাধিক প্রবীণ নেতা।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এডিএমকে-তে বিদ্রোহের পিছনে বিজেপির হাত থাকতে পারে। গেরুয়া শিবির চাইছে বিজয় কংগ্রেসের হাত ছাড়ুন। অন্যদিকে কংগ্রেস শর্ত চাপিয়েছে তাদের পাঁচ বিধায়ক বিজয়কে সমর্থন করবে যদি তিনি কোনও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে হাত না মেলান।

এদিকে, বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে ডিএমকে-র। কিন্তু তার পরেও নিজের পুরনো অবস্থান থেকে একচুলও সরছেন না এমকে স্ট্যালিনের পুত্র উদয়নিধি স্ট্যালিন। মঙ্গলবার অধিবেশন চলাকালীন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি ফের বলেন, সনাতন ধর্মকে নির্মূল করতেই হবে।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে এবারের বিধানসভা ভোটে হেরে গিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা ডিএমকে নেতা এমকে স্ট্যালিন। চেপাউক-থিরুভালিকেনি কেন্দ্র থেকে জিতেছেন উদয়নিধি। তাঁকেই বিরোধী দলনেতা হিসাবে বেছে নিয়েছে ডিএমকে। এদিন বিধানসভায় তাঁর প্রথম ভাষণেই সনাতন ধর্মকে আক্রমণ করেন তিনি।
বিতর্কটা ছিল বন্দে মাতরম নিয়ে। বিজয়ের শপথ অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীতের পরে বন্দে মাতরম গাওয়া হয়। তারপরে তামিলনাড়ুর রাজ্য সঙ্গীত। এতেই আপত্তি জানিয়ে উদয়নিধি বলেন, বন্দে মাতরমের মতো সনাতন গানের জন্য তামিল ভাবাবেগকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। এই প্রসঙ্গেই তাঁর মন্তব্য, যে সনাতন ধর্ম মানুষে বিভেদ তৈরি করে, তা অবশ্যই বিলুপ্ত হওয়া উচিত। মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের টিভিকে শপথ অনুষ্ঠানে তামিলনাড়ুর রাজ্য সঙ্গীত তামিল থাই ভাজুথু শুরুতে বাজানো হয়নি বলেও ক্ষোভ জানান উদয়নিধি। সেদিনই প্রথম বেজেছিল বন্দেমাতরম। উদয়নিধির ক্ষোভ, তামিলনাড়ুর নিজস্ব গানকেই তিন নম্বরে বাজানো হয়। অথচ সেটাই সবার আগে বাজার কথা। বিরোধী পক্ষ তামিল থাই ভাজুথু-কে কোণঠাসা করার চেষ্টা কখনওই মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। বিজয়ের নাম না করে বলেন, আপনার সরকারে শপথ অনুষ্ঠানে এটা ঘটেছে। এটা ভুল হয়েছে। বিধানসভায় আর কখনও এটা হতে দেবেন না। আমরা ঘটতে দেব না। আমাদের রীতি, প্রথা, ঐতিহ্য রক্ষায় সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।
সেই সময় সরকার পক্ষের বেঞ্চে বসেছিলেন তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী সি জোশেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়। উদয়নিধির পুরো বক্তব্যই চুপচাপ শোনেন তিনি। কোনও প্রতিবাদ করেননি। তবে উদয়নিধিকে কার্যত তুলোধনা করেছেন বিজেপি নেতারা। বিনোজ পি সেলভাম বলেন, আপনার এই ধরনের বক্তব্যের কারণে ডিএমকে তামিলনাড়ু থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। সনাতন ধর্ম এবং তার মূল্যবোধ পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত টিকে থাকবে। নয়াদিল্লিতে বিজেপি মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালাও এক্স পোস্টে লেখেন, উদয়নিধি স্ট্যালিন যেটা সবচেয়ে ভালো করতে পারেন অর্থাৎ সনাতন ধর্মের অসম্মান ও তার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো-ফের সেটাই করছেন। এবার তিনি বিধানসভায় বলেছেন, সনাতন ধর্মকে মুছে দেওয়া উচিত। শেষ যখন তিনি একই মন্তব্য করেন, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তাকে ঘৃণা ভাষণ বলেছিল। অতীতেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেননি, উপরন্তু তাঁকে উপমুখ্যমন্ত্রী করেন, কংগ্রেসও কোনও কোনও নিন্দা করেনি বলেও অভিযোগ করে শেহজাদ।

তবে এবারই প্রথম নয়। ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে সনাতন ধর্মকে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন উদয়নিধি। সেই নিয়েও বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, করোন, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গির বিরোধিতা নয়, তাদের নিশ্চিহ্ন করা দরকার। সেই ভাবে সনাতন আদর্শকেও মুছে ফেলতে হবে। এই মন্তব্যের পরে উদয়নিধির বিরুদ্ধে মামলা করেন হিন্দুত্ববাদীদের একাংশ। আদালতে ভর্ৎসনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তবে ফের সেই একই কাজ করলেন উদয়নিধি।