এই সিলভার ক্লোরাইড জলে কোনওভাবেই তো গলে না, বরং সূর্যের আলো যখন এই কালির উপর পড়ে। তখন এটি আরও কালো হয়ে চামড়ার সঙ্গে মিশে যায়। অনেকটাই পুরানো দিনের ফটোগ্রাফিক ফিল্মের মতো।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : ভোট দিয়ে বেরোনোর পর আঙুলে যে কালির দাগ পড়ে, তা সহজে উঠতে চায় না। এটা শুধু প্রশাসনিক কৌশল নয়, এর পিছনে রয়েছে শক্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তি। এই কালি মূলত তৈরি হয় এমন এক রাসায়নিক যৌগ দিয়ে, যা ত্বকের উপরে গভীরভাবে বসে যায় এবং কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। জানেন এই কালির প্রধান উপাদান কী? জানেন কালিতে থাকা কোন যৌগটি ত্বকের উপরের স্তর, অর্থাৎ এপিডার্মিসের কোষগুলির সঙ্গে রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করে? কীভাবে তা ত্বকের প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আরও এক ধরনের গাঢ় রঙ তৈরি করে, যা সাধারণ সাবান বা পানি দিয়ে সহজে উঠে না।
দোরগোড়ায় ২০২৬-র বিধানসভা নির্বাচন। আবারও ভোট দেবেন। ইলেকশন অফিসাররা তাঁর প্রমাণ হিসাবে আপনার আঙুলে কালি দিয়ে দেবেন। যত দিন যাবে, সেই রঙ ক্রমশ আগের থেকে গাঢ় হয়ে যায়। সাবান বা তেল দিয়ে তুলে দিতে চাইলেও , তাতে সফল হওয়া যায় না। কারণ ভোটের কালির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিজ্ঞানের দারুন এক জিনিস। এক রাসায়নিক প্রক্রিয়া। আসল ব্যাপারটা হল, পোলিং বুথে আঙুলে যে কালি লাগিয়ে দেওয়া হয়, তা কোনও সাধারণ কালি বা রঙ নয়। এটাকে বলা হয় ইনডেলিবেল ইঙ্ক বা নন রিমুভাল কালি। এবার ব্যাপারটা হল, কালিটার মধ্যে কী এমন আছে। রসায়নের ভাষায় বললে, এই কালির প্রধান উপাদান সিলভার নাইট্রেট। প্রাকৃতিকভাবে আমাদের শরীরে সামান্য নুন রয়েছে। যখনই সিলভার নাইট্রেট আমাদের আঙুলে লাগানো হয়, সেটা তখনই আমাদের চামড়ায় থাকা ওই লবনের সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু করে দেয়। আর তৈরি করে সিলভার ক্লোরাইড। আর এই সিলভার ক্লোরাইড জলে কোনওভাবেই তো গলে না, বরং সূর্যের আলো যখন এই কালির উপর পড়ে। তখন এটি আরও কালো হয়ে চামড়ার সঙ্গে মিশে যায়। অনেকটাই পুরানো দিনের ফটোগ্রাফিক ফিল্মের মতো। আলো যত পড়ে , ছবি তত ফুটে ওঠে। ঠিক তেমনই ভোট দিয়ে আপনি যতই রোদে ঘুরবেন, ততই আঙুলের দাগ কালো হবে বা গাঢ় হবে।
এবার কেউ কেউ ভাবতেই পারেন, ব্লিচিং পাওড়ায়, নেলপালিশ রিমুভার জাতীয় জিনিস দিয়ে কালি তুলে দেবেন, কিন্তু ভুলেও সেটা করবেন না। কারণ এই কালির আসল কায়দা হল, এটি শুধুমাত্র চামড়ার উপরেই থাকে না, এটি একেবারে চামড়ার কোষে মিশে যায়। তাই এই দাগ তোলার একমাত্র উপায়, অপেক্ষা করা, বা সময় নেওয়া। সময়ে সঙ্গে সঙ্গে চামড়ার উপরে ডেড সেল তৈরি হয়, আবার নতুন কোষ তৈরি হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া হতে সময় নেয়, দুই থেকে চার সপ্তাহ। অর্থাৎ যতদিন ডেড সেল উঠে গিয়ে নতুন সেল তৈরি না হচ্ছে, ততদিন এই দাগ থাকবে। চিকিৎসকরা বলেন, জোর করে কেমিক্যাল দিয়ে এই দাগ তুলতে গেলে, আঙুল পুড়ে যেতে পারে। কিন্তু আঙুল থেকে দাগ উঠে যাবে না।
আচ্ছা এই কালির পরিকল্পনাটা কীভাবে এল বা কোথা থেকে এল। ঘুরে আসা যাক ইতিহাসের পাতা থেকে। ১৯৬২ সালের নির্বাচন কমিশন প্রথম এই সমস্যার সম্মুখীন হন। দেখা যায়, বেশ কয়েকজন ভোটার, একবার ভোট দিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে আবার ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। এই জালিয়াতি থামানোর জন্য নির্বাচন কমিশন বিজ্ঞানীদের সম্মুখীন হন। তারপর থেকেই মাইসোর পেন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড এই কালি তৈরি করা শুরু করেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের জন্য এই কালি সরবরাহ করে আসছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এই কালির সুনাম রয়েছে, কারণ এটি নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর। ভারত ও পাকিস্তান ছাড়া, ইরাক ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলিতে এই কালির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তবে সব দেশ কিন্তু এই কালির উপর নির্ভর করে না। অনেক দেশই জালিয়াতি রুখতে আধুনিক পদ্ধতির সাহায্য নিচ্ছে। উন্নত দেশগুলিতে আধুনিক কালির বদলে ডিজিট্যালভাবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যান করা হয়। আবার কিছু দেশ ভোটার কার্ডের বারকোড না কিউআর কোর্ড স্ক্যান করে।
তবে সবথেকে কঠোর ব্যাপার যে, কোল্ডডিঙ্কের রেসিপি যেমন গোপন রাখা হয়, তেমনই এই কালির সঠিক ফর্মুলাটাও টপ সিক্রেট। কারখানায় যারা কাজ করেন, তারাও জানেন না এই রাসায়নিক মিশ্রণের সঠিক অনুপাত কি। নিরাপত্তার স্বার্থে এটি গোপন রাখা হয়েছে। তবে বাঙালি হিসাবে আমাদের একটি স্বভাব রয়েছে. সব কিছুতেই আমরা একটু ফাঁক ফোকড় খুঁজি। নির্বাচনের সময় অনেকেই নানান ফন্দি বের করেন। ইন্টারনেটে বা লোকমুখে শোনা যায়, অনেকেই ভোট দিতে যাওয়ার আগে, কেউ যদি আঙুলে ভ্যাসলিন, তেল বা নেলপালিশ লাগিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে কালি চামড়ায় বসে না। পরে একটা টিস্যু দিয়ে ঘসলেই উঠে যায়।
তাই যারা ভোটকেন্দ্রের মধ্যে থাকেন, তারাও কম যান না। তাই তাঁরা যথেষ্ট সজাগ থাকেন। তাই কালি লাগানোর আগে পোলিং অফিসার আপনার আঙুল শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নেন। যাতে এই জারিজুরি করা যায় না। আর সিলভার নাইট্রেট এতটাই শক্তিশালি যে এটি তেলের পাল্টা আস্তরণ ভেদ করে চামড়ার মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। আগে অনেকে পেঁপের রস বা লেবুর রস দিয়ে চেষ্টা করেছেন, তবে তাতেও কোনও কাজ হয়নি। তাই এসব চালাকি একেবারে অচল।
সব মিলিয়ে, ভোটের কালি শুধু একটা দাগ নয়, এটা গণতন্ত্র রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অস্ত্র। এর রাসায়নিক গঠন এবং প্রয়োগ পদ্ধতি এমনভাবে তৈরি, যাতে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়।