পাক সেনা কর্তাদের বাংলাদেশ সফরের সময়ে একাধিক কর্মসূচিতে দেখা মেলেনি বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের। জেনারেল ওয়াকারের অনুপস্থিতিতে প্রশ্ন!
জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করেন পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা। তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন সস্ত্রীক। তার সঙ্গে পাক সেনার আরও উচ্চপদস্থ আধিকারিকরাও ছিলেন। তারা ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে প্রথমে দেখাই করেননি জেনারেল ওয়াকার। কোথায় ছিলেন তিনি। ধৈর্য্য ধরুন। জানাব। বাংলাদেশে পাক দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল পাক সেনার প্রতিনিধি দলকে। অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস ও বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপেদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন পাক সেনা কর্তারা। সেখানেও ছিলেন না ওয়াকার। পাক প্রতিনিধি দলের সন্মানে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেছিল অন্তবর্তী সরকার, সেখানেও অনুপস্থিত ছিলেন ওয়াকার। এখানেই শেষ নয়। ঢাকার সেনাকুঞ্জে শাহির শামশাদ মির্জাকে গার্ড অফ অনার দেওয়া হয়। সেই গার্ড অফ অনারের অনুষ্ঠানেও দেখা যায়নি ওয়াকারকে। তখনই বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে দানা বাঁধছিল একটা প্রশ্ন। কোথায় ওয়াকার। কিছু কি ঘটছে তাহলে বাংলাদেশে। কেন তিনি অন্তরালে।

বাংলাদেশ সেনার প্রিন্সিপাল স্টাফ জেনারেল কামরুল হাসানের সঙ্গে পাক প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বৈঠক করেন। ৪৫ মিনিটের সেই বৈঠক ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই বৈঠক হয় ওয়াকারহীন। এটা জেনে রাখুন বাংলাদেশ সেনার প্রিন্সিপাল স্টাফ জেনারেল কামরুল হাসান কিন্তু ওয়াকারের অধীনে নয়। তিনি কাজ করেন সেদেশের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। বর্তমানে অন্তবর্তী সরকারের অধীনে তাঁর কাজ। অন্যদিকে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর প্রধান জেনারেল অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসানের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন পাক সেনাকর্তারা। তারা বৈঠক করেছিলেন বাংলাদেশ
বিমান বাহিনীর প্রধান চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গেও। প্রত্যকেটা বৈঠক হয়েছিল পৃথক পৃথক ভাবে। এই সমস্ত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের কোথাও দেখা যায়নি বাংলাদেশ সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকারকে। ২৭ অক্টোবর পাক সেনা প্রতিনিধি দল গিয়েছিলেন সিলেটে। সেখানকার সেনানিবাস তারা ঘুরে দেখেন। জানা যাচ্ছে, ওই সেনানিবাসেই জেনারেল ওয়াকারের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা ছিল পাক সেনার প্রতিনিধি দলের। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারনে ও ওয়াকারের অনুপস্থিতির কারনে সেই বৈঠক বাতিল হয়। মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের স্মৃতিতেও পুষ্পস্তবক দিতে দেখা যায় পাক প্রতিনিধি দলের সদস্যদের। বোঝাই যাচ্ছে. হাসিনাহীন বাংলাদেশে বে়ড়েছে পাক প্রীতি। এর পিছনে কি তাহলে আই.এস.আই-এর মদত রয়েছে। এই প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয়।
বাংলাদেশে যখন পাক সেনাকর্তার প্রতিনিধি দল একের পর এক বৈঠক করছেন তখন ওয়াকারের এইভাবে গায়েব হয়ে যাওয়া কতটা চিন্তার বুঝতে পারছেন। যদিও পরে ঢাকায় সেনাবাহিনীর সদর দফতরে ওয়াকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা। যে প্রশ্নটা আমার মনে তৈরি হয়েছে, আমার বিশ্বাস সেই প্রশ্ন আপানাদেরও। ওয়াকারের দেশে পাক সেনাকর্তার একের পর এক বৈঠক, কিন্তু ছিলেন কোথায় ওয়াকার। ইচ্ছাকৃত ভাবে কি তিনি পাক প্রতিনিধি দলকে এড়িয়ে গিয়েছেন। কারন ওয়াকারের সঙ্গে তো পাকসেনা কর্তাদের সম্পর্ক ভালোই। তাহলে হঠাৎ কেন পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন তিনি। এর পিছনে কি রয়েছে অন্য কোনও কারণ, না রহস্য। এই প্রশ্নটাও উঠছে, পাক সেনাকর্তাদের বাংলাদেশ সফরের সময় স্বেচ্ছায় কি গ্রেফতার হয়েছিলেন ওয়াকার। নাকি তিনি আয়না ঘরে বন্দী ছিলেন। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, ওই সময় ঠাকুরগাঁও হয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন ওয়াকার। এই দাবি যদি সত্য়ি হয়, তাহলে কি হাসিনার সঙ্গেও দেখা করেছিলেন ওয়াকার। কথা কি হয়েছে দু’জনের বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে।
এটা তো সত্যি, বাংলাদেশ সেনার সন্মান মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন ওয়াকার। প্রতিটি দেশ তাদের সেনবাহিনীকে নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু, ওয়াকারের কারণে বাংলাদেশ সেনার তিন শাখা আজ কলুষিত। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে ওয়াকার ব্যর্থ সেনানায়ক। ওয়াকারের সময়ে সেনার ২৫ জন অফিসারের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিয়ে আসা হয়েছে। ওয়াকার চেয়েছিলেন এই ২৫ জনের বিচার হোক সেনা আদালতে। কিন্তু ওয়াকারের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। ওই অভিযুক্ত সেনাদের বিচার হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে। তবে ওয়াকার একটি দিক থেকে সফল। বাহিনীর অভিযুক্ত অফিসারদের যাতে থাকা খাওয়ার কোনও অসুবিধা না হয় তার জন্য সেনা নিবাসে একটি অস্থায়ী কারাগর তৈরি করা হয়েছে। অভিযুক্ত সেনাদের কাশেমবাজার জেলে না নিয়ে গিয়ে ওই অস্থায়ী কারাগারেই রাখা হয়েছে। এবং সেটা হয়েছে ওয়াকারের নির্দেশেই। সম্প্রতি ওয়াকার ও ইউনুসের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে মহম্মদ ইউনুসকে অভিযুক্ত সেনাদের নিয়ে নিজের অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন ওয়াকার।
মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সেনাদের তো পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা। কিন্ত, সেটা কেন হল না। সেটা নিয়েও একটা প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন মহল থেকে। জানা যাচ্ছে, বাহিনীর অভিযুক্ত সদস্যরা গ্রেফতারি পরোয়ানা পাননি। অনেকে এটাকে আবার কৌশলও বলছেন। তবে,আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য,যাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালেই হবে। ২২ অক্টোবর অভিযুক্ত সেনাদের হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যদি ওই দিন কোনওভাবে তারা হাজিরা এড়িয়ে যেতেন, তাহলে তাঁদের পলাতক ঘোষণা করা হত। তবে হাজিরা দিয়ে বাহিনীর অভিযুক্ত সদস্যরা জানান তারা আত্মসমর্ণন করেছেন। আরও একটা প্রশ্ন কিন্তু থাকছে। কী বলুন তো। কেন হাসিনার আমলের সেনাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এই সেনা তো খালেদা জিয়ার আমলেও ছিল। হুসেন মহম্মদ এরশাদের আমলেও ছিল। সেই সময়ও তো সাধারণ মানুষের উপর কম অত্যাচার হয়নি। তাহলে সেই সময়ের সেনাদের কেন কাঠগড়ায় তোলা হল না। তাদের কেন ছেড়ে দেওয়া হল। তবে মামলার ভবিষ্যৎ কি সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। নির্বাচনের আগেই কি মামলার নিষ্পত্তি হবে।
এরই মাঝে আর একটা টুইস্ট বলি, হাসিনাকে দেশে ফেরাতে সাউথ ব্লক একেবারে উঠেপড়ে গেলেছে। এবং হাসিনাকে ফেরাতে পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাবেন ট্রাম্প সেটাও স্পষ্ট করেছেন। আপনারা জানেন, আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বাংলাদেশে। তারা নির্বাচনে লড়তে পারবেন না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। কিন্তু হাসিনা কি বলছেন, তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তার দলকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে ভোট হলে তিনি কোনও অবস্থাতেই তিনি দেশে ফিরবেন না। তিনি ভারতেই থাকবেন। মুজিব কন্যার বক্তব্য,আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অযৌক্তিক নয়, এটা লড়াইয়ের ময়দানে নামার আগে জোর করে হারিয়ে দেওয়ার সমান। এই পরাজয় মেনে নেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের পিছনে লাখো মানুষের সমর্থন রয়েছে। অন্তবর্তী সরকার আমার দলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, এর অর্থ আমার দলের সমর্থকরা তাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। একটি সরকার কোনওভাবেই দেশের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারে না। এটা সংবিধান বিরোধী। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মী বর্তমানে জেলে। কেউ বা পালিয়ে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা অভিযোগও নিয়ে আসা হয়েছে। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংগঠন একটি রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছে, অবিলম্বে আওয়ামী লীগ কর্মীদের জেলমুক্ত করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মিখ্যা অভিযোগও প্রত্যাহার করে নিতে হবে ইউনুসের সরকারকে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনও চাপে রেখেছে ইউনুসকে। ইউনুসের উপর শুধু ট্রাম্পের চাপ নয়,চাপ রয়েছে নয়াদিল্লিরও। মধ্য প্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ চায় হাসিনা ফিরে আসুন। আর ইউনুসও খুব ভালো করেই জানেই, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে নির্নাচন হলে, সেই নির্বাচন কোনও ভাবেই স্বীকৃতি পাবে না। ইউনুস যে চাপে তা বলা যায়।