যুদ্ধ, তেল সংকট : মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী

“পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিক পদক্ষেপ করছে কেন্দ্র”, লোকসভায় দাঁড়িয়ে আশ্বাস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : ইরান, ইজরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের জেরে উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া। এরইমধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ যেতে না দেওয়ার কারণে গোটা বিশ্বেই তেল এবং গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিভিন্ন দেশগুলিকে। ব্যাপকভাবে ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে ভারতকেও। গ্যাসের অভাবে কোথাও রেস্তোঁরা বন্ধ হচ্ছে, কোথাও আবার মেনুতে হচ্ছে কাটছাঁট। অফিসযাত্রী থেকে শুরু করে স্কুল পড়ুয়া সমস্ত বয়সের মানুষজনকেই।  যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রথমবার মুখ খুললেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi). সোমবার লোকসভায় এই নিয়ে বক্তব্য পেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইরানের সংঘাত ঘিরে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার প্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে তিনি জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিক পদক্ষেপ করছে কেন্দ্র।

লোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, “যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩.৭৫ লক্ষ ভারতীয় নিরাপদে দেশে ফিরেছেন, যার মধ্যে ইরান থেকে ফিরেছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। সংকটের শুরু থেকেই প্রতিটি ভারতীয়কে সর্বতভাবে সাহায্য করা হচ্ছে।”

মোদী আরও বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই সংকট শুধু অর্থনীতির উপরেই নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে।যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।”

ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ভারত সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে। বর্তমানে ভারত ৪১টি দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করছে এবং সরবরাহে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে।”

লোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন মোদী। তিনি জানান, “রেল বিদ্যুতায়ন এবং মেট্রো পরিষেবার সম্প্রসারণের ফলে জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে। রেল বিদ্যুতায়ন না হলে বছরে অতিরিক্ত ১৮০ কোটি লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হত।”

এই ইস্যু টেনে আগামীদিনে বৈদ্যুতিক বাস পরিষেবা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানির উপর জোর দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

কৃষিক্ষেত্রে উদ্বেগ দূর করতে প্রধানমন্ত্রী জানান, “দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং অতীতের মতো এবারও কৃষকদের কোনও সমস্যায় পড়তে হবে না।”

একইসঙ্গে আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে মন্ত্রীদের একটি কমিটি প্রতিদিন বৈঠক করছে বলেও জানান তিনি।

বিদেশে থাকা ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দাবি, “যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ লক্ষ ব্যারেল তেল ভারতে আসত। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ভারত, চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি এই সরবরাহের উপর বড়সড়ভাবে নির্ভরশীল।

কিন্তু ইরানে যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন জ্বালানি পরিকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় চার বছরের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। দেশে পেট্রোল ও রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।”

এই পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে মোদীর আশ্বাস, “আমাদের সরকার চেষ্টা করেছে যাতে পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসের সরবরাহে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে এবং সাধারণ পরিবারগুলো সমস্যায় না পড়ে।”

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, “গত এক দশকে ভারত তার জ্বালানি আমদানির উৎস উল্লেখযোগ্যভাবে বৈচিত্র্যময় করেছে। আগে যেখানে ২৭টি দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা হত, এখন তা বেড়ে ৪১টি দেশে পৌঁছেছে। পাশাপাশি, দেশে ৫৩ লক্ষ মেট্রিকটন জ্বালানি মজুতের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।”

এলপিজি সিলিন্ডারের ঘাটতি নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়েও প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে প্রায় ৩৩ কোটি পরিবার রান্নার জন্য এলপিজির উপর নির্ভরশীল। মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু ও কলকাতার বহু রেস্তোরাঁ ইতিমধ্যেই পরিষেবা কমাতে বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। যদিও ১১ মার্চ সরকার জানিয়েছে, এলপিজি উৎপাদন ২৫ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য, ভারতের মোট এলপিজি চাহিদার ৬০ শতাংশই আমদানি নির্ভর, যার ৯০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের পাশাপাশি সারবাহী জাহাজগুলির নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক স্তরে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে সরকার। ভারতের নাইট্রোজেন সার আমদানির প্রায় ৬৩ শতাংশ এবং ডিএপি-র ৩২ শতাংশ উপসাগরীয় দেশগুলির উপর নির্ভরশীল, যা কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে জ্বালানি সংকটের আবহে জ্বালানি আমদানি কমাতে বিকল্প উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, “আমরা পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণ করছি। এর ফলে ৪.৫ কোটি ব্যারেল কম তেল আমদানি করতে হচ্ছে।” সবমিলিয়ে, বৈশ্বিক সঙ্কটের মধ্যেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে সরকার যে বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা নিয়ে সংসদে স্পষ্ট বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।