বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান ঠিক কী ? যিনি ৮ টি যুদ্ধ নিরসনের দাবি রাখেন, তিনি কীভাবে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করার ইন্ধন যোগাচ্ছেন।

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : ইরানের সঙ্গে যখন আলোচনার পথ খুঁজছে ট্রাম্প প্রশাসন । ঠিক তখনই পশ্চিম এশিয়ায় নিজেদের সামরিক শক্তি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। পাঠান হচ্ছে আরও কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা । আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। সূত্রের খবর,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন’-এর কয়েক হাজার সেনাকে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানো হবে। তবে এই সেনাদের ঠিক কোন দেশে মোতায়েন করা হবে এবং তারা কবে নাগাদ সেখানে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি। যদিও হোয়াইট হাউস এবিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে নারাজ। এখন প্রশ্ন উঠতে আদতে কি চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনস্তত্ত্ব বোঝা বড়ই কঠিন। প্রশ্ন উঠছে তিনি সাহসী নাকি ভিতু? তিনি নাকি যুদ্ধবিরোধী। পহেলগাঁও হামলার পর ভারতের অপারেশন সিঁদুর।পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যখব কড়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিল ভারত। তখন এই ট্রাম্পই ভারতকে শান্ত হওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন।শুধু ভারত নয় অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও তিনি নাকি যুদ্ধ রোখায় বড় ভূমিকা পালন করেছেন। আর তাই, দীর্ঘদিন ধরে নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবি করে আসছেন তিনি। নিজেকে বিশ্বজুড়ে শান্তি স্থাপনের কারিগর হিসেবে দাবি করে এই দাবি জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প নাকি, আটটি বড় যুদ্ধ বা সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রেখেছেন ।যদিও অনেক ক্ষেত্রে তার এই দাবির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে ।
এদিকে দিন যত এগোচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি ভাবাচ্ছে অন্যান্য দেশকে। কেননা এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হুরমুজ প্রনালী। গ্যাস ও তেল সরবারের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম।সেখানে কড়াকড়ি বাড়লে সমস্যায় পড়বে ভারত সহ বহু দেশ। ইতিমধ্যেই যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা হয়েছে বলেছে দাবি করে ট্রাম্প প্রশাসন।তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দুই দেশের মধ্যে ‘খুব ভালো’ আলোচনা হয়েছে– মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন দাবির পর ইরান এটাকে ‘ভুয়ো খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। আরও জোড়ালো হয়েছে পাল্টাপাল্টি হামলা। ইজরায়েলের তেল আভিভে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। হামলা হয়েছে অন্য শহরগুলোতেও। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। তেহরানসহ ইরানেরও বিভিন্ন শহরে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল।এরই মধ্যে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা চালানো পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করার কথা জানিয়েছেন। ইরান বলেছে, হামলা হলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের বিদ্যুৎ ও জল লবণমুক্তকরণ প্রকল্পে হামলা চালাবে। পারস্পরিক হামলার তীব্রতার মধ্যে যুদ্ধ এগিয়ে যাচ্ছে অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে যে বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান ঠিক কী ? যিনি ৮ টি যুদ্ধ নিরসনের দাবি রাখেন, তিনি কিভাবে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করার ইন্ধন যোগাচ্ছেন। এমনিতেই যুদ্ধে জড়ানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাব তৈরী হচ্ছে। বিশ্লেষকরা এটাকে ‘অপরিকল্পিত’ যুদ্ধ বলে বর্ণনা করছেন। ইরানের মিত্র রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার ছিল যুদ্ধের ২৫তম দিন। ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলাকালে ইজরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু হওয়া যুদ্ধে নতুন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নাম আসছে পাকিস্তানের। ভাবা যায় ,কিছুদিন আগেই ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের প্রাক্তন হাইকমিশনার অব্দুল বাসিতের বিস্ফোরক মন্তব্য যা যুদ্ধের উসকানি দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, যদি আমেরিকা বা ইজরায়েল কখনও পাকিস্তান বা তার পারমাণবিক কেন্দ্রে আক্রমণ করে, তাহলে ভারতকে ২৬/১১-এর মতো হামলার মুখোমুখি হতে হবে। সুতরাং সেই দেশ যখন যুদ্ধ বন্ধের মধ্য়স্থতাকারী হয় ,সেক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির ভবিষ্যত নিয়ে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে আসে।

তিন সপ্তাহ ধরে ইরানের মানুষ ধীরে ধীরে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের জীবনকে মানিয়ে নিচ্ছে। ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে প্রায় ২৮টিতেই ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধ ইরানিদের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। তুরস্কের রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের যুদ্ধে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তুরস্ক তার সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে যাবে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইজরায়েলকে তাদের হামলার জন্য নিন্দা ও ঘৃণা জানাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ইরানে ৯ হাজারের বেশি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, দাবি মার্কিন বাহিনীর। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত ইরানের ৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। যাতে ইরানের অন্তত ১৪০টি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানে তাদের হামলা অব্যাহত আছে। গত সোমবার রাতে ইজরায়েলের বিমান বাহিনী ৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। আইডিএফ বলছে, তারা এখনও পর্যন্ত ইরানে তিন হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। সূত্রের খবর, সেখানে এখনও পর্যন্ত ১৫৭ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৬৭ জন আহত হয়েছেন।এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের প্রাক্তন উপদেষ্টা বলেছেন ইরানে মার্কিন পদক্ষেপ ‘পরিকল্পনাহীন’,। যা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম নিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল আচমকা ট্রাম্পের ৫ দিনের যুদ্ধবিরতি, ইরানের সঙ্গে সদর্থক আলোচনার দাবি – এইসবের পিছনে নতুন কি পরিকল্পনা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের। সম্মুখে এইসব আলোচনা অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় আরও কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা। অন্তত সূত্র মারফত সেই তথ্যই উঠে আসছে।কোথাও কি ভীতি কাজ করছে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে। কেননা যেই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী সচল করার জন্য ইরানকে ৪৮ ঘন্টার ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছিল , সেই ট্রাম্পই ইরানে ৫ দিনের যুদ্ধবিরতির কথা বললেন। নাকি ফের নিজের যুদ্ধবিরোধী ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে ট্রাম্পের মনস্তত্ত্ব যাই হোক না কেন, হরমুজকে হাতিয়ার করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশের কাছে মাথা নত না করার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছে ইরান।তবে নিন্দুকেরা বলছেন ভবিষ্যতে আর যুদ্ধ নিরসনের জন্য মেডেল দাবি করার মতো মুখ রইল না ট্রাম্পের।