পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, ভারত কোন পক্ষে ?

আমেরিকা ও ইজরায়েলের পক্ষে কোন কোন দেশ? ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে কে ?  মধ্যস্থতা বা শান্তির বার্তা দিয়েছে কোন কোন দেশ ?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : হামলা-পাল্টা হামলা, সংঘর্ষ। ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢাকা আকাশ। সংঘর্ষের আঁচে উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া। ক্রমশ পরিধি বিস্তার করছে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। গত শনিবার ইরানে হামলা চালায় ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার যৌথ বাহিনী। তাতেই মৃত্যু হয় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পরই পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মাত্রা নতুন স্তরে পৌঁছয়।

সংঘর্ষের আঁচে উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া।  চলছে হামলা, পাল্টা হামলা। ইজরায়েলের জনবসতিতে হামলা চালানোর অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে। আবু ধাবির পোর্ট জায়েদে দেখা যায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ অভিযান অব্যাহত। এই হামলা-পাল্টা হামলার শুরুটা হয়েছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পরই। খামেনেইয়ের হত্যার বদলা নিতে কোমের জলকারান মসজিদে ইজরায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রতীকী ডাক দেয় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি। মধ্য ইজরায়েলে ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে নজনের মৃত্যু। ইজরায়েলজুড়ে ড্রোন হানা রুখতে বিভিন্ন এলাকায় জিপিএস পরিষেবা ব্যাহত। লেবাননের ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজ়বুল্লাকে পাল্টা জবাব দিতে এবার লেবাননের রাজধানী বেইরুটে হামলা ইজ়রায়েলের।  সোমবার ভোরে বেইরুটে বোমা হামলা ইজ়রায়েলের। একাধিক ভিডিয়ো ফুটেজে দেখা যায়, কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উপরের দিকে উঠছে। এক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায় যৌথ অভিযানে নিহত খামেনেইয়ের ছেলে মোজতবাও।  খামেনেইয়ের উত্তরসূরি হওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে ছিলেন দ্বিতীয় পুত্র মোজতবাই।

 এই অবস্থায় ইরানের পাশে রয়েছে তুরস্ক, রাশিয়া, চিন, নরওয়ে, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, হিজবুল্লা গোষ্ঠী। অন্যদিকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের পক্ষে রয়েছে জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, কানাডা, ইউক্রেন, কুয়েত, বাহারিন, আমিরশাহী, সংযুক্ত আরব, কাতার, ব্রিটেন। এছাড়াও এমন অনেক দেশ রয়েছে, যারা কোনওভাবেই কোনও পক্ষে নেই। তারা রয়েছে শান্তির পক্ষে। যুদ্ধ নয়, শান্তি চায় তারা। যে তালিকার প্রথমেই রয়েছে ভারত। ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবার রাতে জরুরি বৈঠকের পর প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট ও পরে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আমিরশাহীতে হামলার ঘটনার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি নেতানিয়াহুর কাছে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করার আবেদনও জানান তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে রবিবার রাতেই মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই বৈঠকে ইরান-ইজরায়েল-সহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে আটকে পড়া ভারতীয়দের দেশে ফেরানো, যুদ্ধে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান ইত্যাদি একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে শান্তির আর্জি জানিয়েছে ভেনেজুয়েলা, ওমান ও আয়ারল্যান্ড।

এর আগেও ইজ়রায়েলের সঙ্গে লেবাননের হিজ়বুল্লা গোষ্ঠী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আমেরিকার হস্তক্ষেপে তাদের মধ্যে শান্তি সমঝোতা হয়। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর এই প্রথম সেই চুক্তি লঙ্ঘিত হয়। তবে হিজ়বুল্লার কার্যকলাপে সায় নেই লেবানন সরকারের। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম ইজ়রায়েলে হিজ়বুল্লার আক্রমণকে দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সন্দেহজনক বলেন। তাঁর দাবি, এর ফলে দেশের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়েছে এবং ইজ়রায়েল তাদের আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ ও অজুহাত পেয়েছে। লেবাননে হামলার জন্য হিজ়বুল্লার পদক্ষেপকে দায়ী করেছে ইজ়রায়েলের বাহিনীও।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন  সরকারকে ইরানি দূতাবাসের পক্ষ থেকে কঠোর ভাষায় আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান করা হয়। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় শাসক আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যার নিন্দা করার জন্যও আহ্বান জানানো হয়। খামেনেইকে হত্যার জন্য গভীর শোক প্রকাশ করে দূতাবাস। পতাকা রাখা হয়েছে অর্ধনমিত।

ইরানে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলা চলতে পারে আরও চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ। রবিবার রাতে এমনটাই জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, যদি দরকার হয় ইরানে আরও চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ হামলা চালানো হতে পারে। তাতে আমেরিকার কোনও সমস্যা হবে না। ইজ়রায়েলও হামলায় মার্কিন সমর্থন পাবে। ইরান নিয়ে আমেরিকার পরবর্তী পরিকল্পনাও চিন্তা করে ফেলেছেন ট্রাম্প। দাবি করেন, ইরানের নেতা হিসাবে তিন জনকে তিনি ভেবে রেখেছেন। তবে কী ভাবে ইরানের শাসনভার হস্তান্তর হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বলেন, ইরান কে চালাবেন,তাঁর কাছে তিনটে দারুণ নাম রয়েছে। তবে নামগুলি এখনই প্রকাশ্যে আনতে চাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেন এখনই সেই তিনটে নাম তিনি বলবেন না। সেই নাম তিনি পরে স্পষ্ট করবেন।  বাস্তবে ইরান অবশ্য এত সহজে আত্মসমর্পণে রাজি নয়। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর তারা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে, দেশ চালানোর জন্য তিন সদস্যের কাউন্সিল গঠন করা হবে। তার সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে খামেনেই ঘনিষ্ঠ আলিরেজা আরাফির নাম। খামেনেই হত্যার প্রতিশোধের বার্তা দিয়েছে তেহরান। তাহলে এবার দেখার বিষয এই যুদ্ধ চসার যে সময়সীমার কথা দাবি করেছেন ট্রাম্প, নাকি তার আগেই শেষ হতে চলেছে যুদ্ধ। যদিও ভারত বরাবরই শান্তির পথে।