৫০ বছরে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় ১০টি রেল দুর্ঘটনা কোনটি।

বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা কী কারণে ঘটেছিল? যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্রেন দুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসের পাতা উল্টে জেনে নেওয়া যাক, ৫০ বছরে ঘটে যাওয়া ১০টি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার খুঁটিনাটি।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক :  কখনও এক্সপ্রেসের পিছনে ধাক্কা মালগাড়ির। কখন লাইনচ্যুত হয়ে দুর্ঘটনা। গত কয়েক দশকে একাধিক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে বিশ্বে। আর সেইসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু যাত্রী। জখমও হয়েছেন বহু।  সেইসব দুর্ঘটনার তদন্তে নেমে কখনও নাশকতার তত্ত্ব উঠে এসেছে। কখনও চালকের গাফিলতির কথা।  কিন্তু জানেন কি গত ৫০ বছরে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় ১০টি রেল দুর্ঘটনা কোনটি। বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা কী কারণে ঘটেছিল? যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্রেন দুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিত।  ইতিহাসের পাতা উল্টে জেনে নেওয়া যাক, ৫০ বছরে ঘটে যাওয়া ১০টি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার খুঁটিনাটি।

২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর। ভারত মহাসাগরে আছড়ে পড়ে  বিধ্বংসী সুনামি। যা গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। সেই সুনামি শুধু উপকূলীয় জনপদ নয়, ট্রেন পরিবহন ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করে দেয়। শ্রীলঙ্কা সেই সময় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখোমুখি হয়। সুনামির ভয়াল ঢেউ আছড়ে পড়ে শ্রীলঙ্কার উপকূলে। সেই সময় শ্রীলঙ্কার এক যাত্রীবাহী ট্রেন, ‘দ্য কুইন অব দ্য সি’ বা ‘ওশান কুইন এক্সপ্রেস’ সুনামির ঢেউয়ের কবলে পড়ে। এই ট্রেনটিই হয়ে ওঠে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়  ১,৭০০ জনেরও বেশি যাত্রী প্রাণ হারান। ট্রেনটি তেলওয়াটা  সংলগ্ন পেরালিয়া গ্রামের নিকটবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল রেলপথে চলছিল।  একটি সিগনালে দাঁড়িয়েছিল ট্রেনটি। সেইসময় হঠাৎ করে ৬০ ফুট উচ্চতার সুনামি এসে ট্রেনটিকে একেবারে রেললাইন থেকে ছিটকে ফেলে দেয়। আটটি কোচ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসে ট্রেনটির আটটি বগি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। ঢেউয়ের গতি এতটাই বেশি ছিল যে গোটা ট্রেনটাকেই সমুদ্রের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়, কোনোভাবেই রক্ষা পাননি যাত্রীরা । প্রাণ হারান প্রায় ১,৭০০ যাত্রী।  যদিও ৭০০-৮০০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার সম্ভব হয়। বাকি দেহগুলো সাগরের ঢেউয়ে হারিয়ে যায়।

তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে  ১৯৮১ সালের ৬ জুন  বিহারে ঘটে যাওয়া রেল দুর্ঘটনা।  ৯টি বগির একটি  প্যাসেঞ্জার ট্রেন যাত্রা করছিল। ভিড়ে ঠাসা ছিল ট্রেন। সেই যাত্রা আর সম্পন্ন হয়নি। বিহারের বাগমতি নদী পেরনোর সময় ৯টির মধ্যে ৭টি বগি নিয়ে নদীতে ভেঙে পড়ে ট্রেন। ওই ট্রেন দুর্ঘটনায় ৮০০ জন বা তাঁর বেশি যাত্রীর মৃত্যু হয়। যদিও সরকারি তথ্য অনুসারে, ১২ জুন দুপুরের মধ্যে সরকার ২০০টি দেহ উদ্ধার করে। সরকারি ভাবে ২৩৫ জনের মৃত্যুর কথা ঘোষণা করে। ৩০ জনের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ৮৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ওই সময়ে বিহারের বালাঘাটে চলছিল প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের দাপট। ফলে উদ্ধার কাজ হয়ে দাঁড়ায় আরও কঠিন।

১৯৮৯ সালে ৪ জুন তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার উফা শহরে ঘটে দুর্ঘটনা। দুদিক থেকে দুটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন একে অপরকে অতিক্রম করে যাচ্ছিল। ট্রেন লাইনের নীচ দিয়ে চলে গিয়েছিল  পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস পাইপলাইন। হঠাৎ সেই লাইনে গ্যাসের চাপ বেড়ে যায় । আর তার ফলে লাইনটি লিক হয়ে গ্যাস বেরিয়ে পড়ে। সেই সময় উপর দিয়ে যাচ্ছিল ট্রেন। ফলে আগুন ধরে যায়। আর সেই আগুন এক ট্রেন থেকে আরেক ট্রেনে ছড়িয়ে পড়ে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় মারা যান ৭৮০ জন।

১৯৯৫সালের ২০শে আগস্ট।  আগ্রা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে ফিরোজাবাদ স্টেশনের ঠিক বাইরে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা। উত্তর প্রদেশের ফিরোজাবাদে দিল্লিগামী দুটি যাত্রীবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। নিহত হন ৩৫৮ জনেরও বেশি যাত্রী । দিল্লি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে কালিন্দী এক্সপ্রেস ফিরোজাবাদে ট্র্যাকের উপর একটি গরুকে ধাক্কা দেওয়ার পর এই দুর্ঘটনা ঘটে। ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক করার কারণে ট্রেনটি থেমে যায়, সেই সময় পুরুষোত্তম এক্সপ্রেসটি পেছন থেকে ট্রেনটিকে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষে কালিন্দী এক্সপ্রেসের তিনটি কোচ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  পুরুষোত্তম এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন এবং দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়।  কমপক্ষে ২০০ জন আহত হন এবং ৩৫৮ জনের মৃত্যু।

২০২৩ সালের ২জুন। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ তিনটি ট্রেনের সংঘর্ষে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ওড়িশার বালাসোরের বাহানাগা স্টেশনের কাছে ৷ শালিমার-হাওড়া করমণ্ডল এক্সপ্রেস চেন্নাই যাচ্ছিল ৷ ট্রেনটি বাহানাগা স্টেশনের কাছে একটি মালগাড়িকে ধাক্কা মারে ৷ এর ফলে করমণ্ডল এক্সপ্রেসের বেশ কয়েকটি বগি পাশের ট্র্যাকে ছিটকে পড়ে ৷ ওই ট্র্যাক দিয়ে বেঙ্গালুরু থেকে যশবন্তপুর সুপারফাস্ট ট্রেন আসছিল৷ সেটি বেঙ্গালুরু থেকে হাওড়ার দিকে যাচ্ছিল ৷ ট্র্যাকে লাইনচ্যুত বগিগুলির সঙ্গে ওই ট্রেনের ধাক্কা লাগে ৷ ফলে যশবন্তপুর সুপারফাস্টের কয়েকটি বগিও লাইনচ্যুত হয় ৷ করমণ্ডল এক্সপ্রেসের প্রায় ২১টি বগি লাইনচ্যুত হয় ৷  ৯০০ জন গুরুতর আহত হন৷ মৃত্যু হয় ৩০০ জনের। তড়িঘড়ি শুরু হয় উদ্ধারকার্য ৷ দুর্ঘটনার পরেরদিন সকালে মনে হচ্ছিল যেন, কেউ হাতে করে একটি ট্রেনের বগি আরেকটি ট্রেনের উপর তুলে দিয়েছে ৷ অথবা বগিগুলি এদিক ওদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে । ২০২৩ সালে ভারতে একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে ৷ যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ২ জুনের সন্ধ্যায় ওড়িশার বালাসোর স্টেশনের কাছে তিন ট্রেনের সংঘর্ষ।

উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুরের গঞ্জ গাইসাল। সে গঞ্জে ছবির মতো ছিমছাম ছোট রেলস্টেশন। সেই স্টেশন আর সেই প্রত্যন্ত গঞ্জের নাম গোটা রাজ্য তথা দেশ জেনে গিয়েছিল। ১৯৯৯ সালে উত্তর-দিনাজপুর বিহার সীমানার ছোট্ট গ্রাম গাইসালের নির্ঘুম রাত কেটেছিল সেদিন। সেদিনও একটার উপর একটা ট্রেন উঠে গিয়ে মৃত্যু । মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় অবধ অসম এক্সপ্রেস আর ব্রহ্মপুত্র মেলের। মৃত্যু হয় অন্তত ৩০০ যাত্রীর। দু’দশক পেরিয়ে এসেও সেই বীভৎসতার কথা ভুলতে পারেনি গাইসাল তথা ইসলামপুরবাসী। ভয়ঙ্কর সেই রাতের স্মৃতি এখনও ততটাই যন্ত্রণা দায়ক স্বজনহারা পরিবারগুলির কাছে।

এরপরে যে রেল দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ উঠে আসে , তা হল জম্মু তাওয়াই-শিয়ালদহ এক্সপ্রেস অমৃতসরগামী ফ্রন্টিয়ার গোল্ডেন টেম্পল মেল-এর লাইনচ্যুত। দিনটা ছিল ১৯৯৮ সালের ২৬ নভেম্বর । পাঞ্জাবের খান্নার কাছে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। জম্মু তাওয়াই-শিয়ালদহ এক্সপ্রেস অমৃতসরগামী ফ্রন্টিয়ার গোল্ডেন টেম্পল মেল-এর লাইনচ্যুত ছয়টি বগিতে ধাক্কা মারে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ২১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

পরবর্তী যে রেল দুর্ঘটনার কথাটি বলব , তা হল ইন্দোর-পাটনা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা।  ২০১৬-সালের ২০ নভেম্বর। কানপুর গ্রামীণ জেলার পুখরায়ান এলাকায় ইন্দোর-পাটনা এক্সপ্রেসের ১৪টি বগি লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনাটিতে ১৫২ জনের মৃত্যু হয়।  এই ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদী নাশকতা বলে দায়ী করে সরকার তদন্তভার তুলে দিয়েছিল, জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএর হাতে।  তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু বলেছিলেন, বহিরাগতরা এক্ষেত্রে সম্ভবত হস্তক্ষেপ করেছেন।’ ২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে একটি নির্বাচনী সমাবেশে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই ট্রেন দুর্ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে অভিযোগ করেছিলেন।

২৮ মে, ২০১০ সাল। মাওবাদীদের দাপটে তখন অশান্ত জঙ্গলমহল। রাত একটা তিরিশ মিনিটের কিছু আগে খড়গপুর ছেড়ে মুম্বইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস। কিছুটা এগিয়ে এসে ঝাড়গ্রামের সরডিহার  কাছে লাইনচ্যুত হয় ট্রেনটি। হঠাৎ করেই যেন মৃত্যু উপত্যকা। দুমড়ে যায় জ্ঞানেশ্বরীর S-3, 4, 5, 6 এবং 7 সহ একাধিক কামরা। ঘটনায় প্রাণ গিয়েছিল কয়েকশো মানুষের। এর পেছনে ছিল মাওবাদীদের ষড়যন্ত্র। এখানেই শেষ নয়। আসল কাহিনি শুরু হয়েছে পরে। দুর্ঘটনার তদন্তে নেমে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ওই এলাকার রেললাইনের ফিসপ্লেট আগে থেকেই আলগা করা ছিল। ফলে নিছক দুর্ঘটনা নয়। এর পিছনে নাশকতা রয়েছে। ওই এলাকায় সেইসময় কয়েকদিন ধরেই মাওবাদীরা বনধ ডেকেছিল। ঘটনার তদন্তে নেমে ১১ জন সন্দেহভাজন মাওবাদীকে গ্রেফতারও করা হয়। জ্ঞানেশ্বরী দুর্ঘটনায় ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়। জখম হন ১৮০ জন।

এছাড়াও ২০১৪ সালে  মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। কাটনগোলা ব্রিজের কাছে একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। যেখানে কমপক্ষে ৮০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু ছিল।

২০১৬ সালে ক্যামেরুনে লাইনচ্যুত হয় ট্রেন । মৃত্যু হয় কমপক্ষে ৭৯ জনের।  ইয়াউন্দে থেকে ডুয়ালাগামী একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার আগে “অস্বাভাবিক” দ্রুত গতিতে চলছিল বল মনে করা হয়।

তালিকা এখানেই শেষ নয়,  ৫০ বছরে ঘটে যাওয়া সবথেকে বড় ১০টি ট্রেন দুর্ঘটনার কথা তুলে ধরলাম। এর পাশাপাশি রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা। রয়েছে মৃত্যু মিছিলের ছবি। রয়েছে প্রিয়জনের জন্য পরিবার- পরিজনদের হাহাকার।