সমালোচনা, ব্যর্থতা, বয়স সবকিছুকে পিছনে ফেলে আবারও উঠে দাঁড়ানোর নাম যেন সিআর সেভেন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে কখনও পরিসংখ্যান হার মানে আবেগের কাছে। আবার কখনও আবেগকে ছাপিয়ে যায় ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। গতি কমে, শরীর ক্লান্ত হয়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যাঁরা বারবার প্রমাণ করেন যে স্বপ্নের কোনও বয়স হয় না। সেই মানুষটির নাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। চার দশক পেরিয়েও তিনি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের নামের পাশে নতুন নতুন ইতিহাস লিখে চলেছেন। সমালোচনা, ব্যর্থতা, বয়স সবকিছুকে পিছনে ফেলে আবারও উঠে দাঁড়ানোর নাম যেন সিআর সেভেন। ৪১ শেও ফিরে আসা যায়।
বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ পর্তুগালের সামনে ছিল কঠিন প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচের আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল দুই কিংবদন্তির শেষ দিকের লড়াই। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও লুকা মদ্রিচ। একসময় রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে পাশাপাশি খেলেছেন। একসঙ্গে জিতেছেন অসংখ্য ট্রফি। মাঝমাঠ থেকে মদ্রিচের নিখুঁত পাসে বহুবার গোল করেছেন রোনাল্ডো। এবার দু’জন ছিলেন দুই বিপরীত শিবিরে। একজনের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে। অন্যজনের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হবে। এই সত্য নিয়েই শুরু হয়েছিল মহারণ। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে পর্তুগাল। রাফায়েল লিয়াও, ব্রুনো ফার্নান্দেস ও রোনাল্ডো বারবার ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগে চাপ তৈরি করছিলেন। ম্যাচের প্রথম কয়েক মিনিটেই ব্রুনো দুটি ভালো সুযোগ পেলেও দুর্দান্ত সেভ করেন গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ। প্রথমার্ধে দুই দলই বেশ কয়েকটি আক্রমণ করলেও গোলের দেখা মেলেনি। রোনাল্ডো ও মদ্রিচ দু’জনকেই কিছুটা নিষ্প্রভ লাগছিল।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৫৩ মিনিটে ইভান পেরিসিচের গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল পর্তুগালের বিশ্বকাপ যাত্রা হয়তো থেমে যাবে। কিন্তু বড় ফুটবলারদের আসল পরিচয়ই হলো কঠিন সময়ে সামনে এসে দাঁড়ানো। পিছিয়ে পড়ার পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে পর্তুগাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রোনাল্ডো বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। হতাশা ছিল, কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি।
৬৮ মিনিটে পেনাল্টি পায় পর্তুগাল। গোটা স্টেডিয়ামের দৃষ্টি তখন এক ব্যক্তির দিকে। ৪১ বছর বয়সী অধিনায়ক এগিয়ে এলেন। এমন মুহূর্তে বড় বড় তারকারাও ভুল করেন। কিন্তু রোনাল্ডো শান্ত, আত্মবিশ্বাসী। নিখুঁত শটে বল জড়িয়ে দিলেন জালে। সমতায় ফিরল পর্তুগাল। শুধু দলকেই ফিরিয়ে আনলেন না। নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডগুলোর একটিও গড়লেন। এটাই ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তাঁর প্রথম গোল। ৮১ মিনিটে কোচ রবার্তো মার্টিনেজ তাঁকে তুলে নেন। অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্তটি কাজে দেয়। বদলি হিসেবে নামা গন্সালো রামোস যোগ করা সময়ে লিয়াওর পাস থেকে জয়সূচক গোল করেন। শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়া গোল করলেও সেটিও অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। ২-১ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলোয় জায়গা নিশ্চিত করে পর্তুগাল।
এই ম্যাচ শুধু একটি জয়ের গল্প নয়। এটি এক কিংবদন্তির ফিরে আসার গল্প। প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হওয়ার পর সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। অনেকেই বলেছিলেন, রোনাল্ডোর সময় শেষ। কেউ কেউ তাঁকে ‘মূর্তি’ বলেও কটাক্ষ করেছিলেন। কিন্তু নিজের উত্তর তিনি দিয়েছেন মাঠে। কথায় নয়, গোলে। এই ম্যাচে রোনাল্ডো একাধিক নজির গড়েছেন। ৪১ বছর ১৪৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করে ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় বয়স্কতম গোলদাতা হিসেবেও নিজের নাম লিখিয়েছেন। বিশ্বকাপে নিজের ২৬তম ম্যাচ খেলেছেন তিনি। যা তাঁকে ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ফুটবলারের তালিকায় তুলে দিয়েছে। বিশ্বকাপ এবং ইউরো মিলিয়ে ২৫টিরও বেশি গোল করার নজিরও এখন একমাত্র তাঁর দখলে। এই জয়ের আবেগ শুধুমাত্র ফুটবলের ছিল না। ম্যাচটি ছিল আরও একটি বিশেষ কারণে স্মরণীয়। ঠিক এক বছর আগে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন পর্তুগালের জাতীয় দলের ফুটবলার দিয়োগো জোটা। মাত্র ২৮ বছর বয়সে থেমে যায় তাঁর জীবন। স্ত্রী, সন্তান, পরিবার এবং পুরো ফুটবল বিশ্বকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। বেঁচে থাকলে এই বিশ্বকাপে তিনিও হয়তো পর্তুগালের অন্যতম ভরসা হতেন।
তাই ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে এই জয় যেন শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচের জয় ছিল না। এটি ছিল প্রয়াত সতীর্থের প্রতি শ্রদ্ধা। শেষ বাঁশি বাজার পর রোনাল্ডো ও তাঁর সতীর্থরা দিয়োগো জোটার জার্সি হাতে নিয়ে মাঠে দাঁড়ালেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন বললেন “এই জয় তোমার জন্য।” আবেগ চেপে রাখতে পারেননি রোনাল্ডোও।
অন্যদিকে, লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হলো মাথা উঁচু করেই। রিয়াল মাদ্রিদের দুই মহাতারকার এই লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসলেন রোনাল্ডো। মদ্রিচও নিজের অসাধারণ ক্যারিয়ারের জন্য চিরকাল ফুটবল ইতিহাসে সম্মানের আসনেই থাকবেন। এবার পর্তুগালের সামনে আরও বড় পরীক্ষা। শেষ ষোলোয় প্রতিপক্ষ শক্তিশালী স্পেন। ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা দল। দুর্দান্ত পাসিং, তরুণদের গতি ও অভিজ্ঞতায় গড়া এক কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী। রোনাল্ডোর সামনে তাই আরও এক কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এই লড়াইয়ে কি আবারও জ্বলে উঠবে সিআর সেভেনের পা? নাকি থেমে যাবে তাঁর শেষ বিশ্বকাপের স্বপ্ন? আপনাদের কী মনে হয়। স্পেনকে হারিয়ে কি কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারবে পর্তুগাল? আর রোনাল্ডো কি আবারও ম্যাচের নায়ক হবেন?