অনুচ্ছেদ ৩৫৬ কী? কোন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ?

অনুচ্ছেদ ৩৫৬ কি আদৌ জারি করা যায়? ৩৫৫ কি তার বিকল্প? নাকি এই দুই অনুচ্ছেদকে এক করে দেখাটাই সাংবিধানিক ভুল?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : অনুচ্ছেদ ৩৫৫। অনুচ্ছেদ ৩৫৬। গত কয়েক বছরে একের পর এক বিজেপি নেতার বক্তব্যে এই ৩৫৬ অনুচ্ছেদের নাম ঘুরে ফিরে এসেছে। কখনও বলা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি শাসন, কখনও আবার বলা হচ্ছে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ- সংবিধানের দোহাই দিয়ে। কিন্তু এখানেই রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা- যে অনুচ্ছেদ ৩৫৬ জারির দাবি এক সময় রাজপথে দাঁড়িয়ে তুলতেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আজ সেই একই অনুচ্ছেদ জারির দাবি উঠছে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধেই। তাহলে প্রশ্নটা সোজাসাপ্টা- অনুচ্ছেদ ৩৫৬ কি আদৌ জারি করা যায়? ৩৫৫ কি তার বিকল্প? নাকি এই দুই অনুচ্ছেদকে এক করে দেখাটাই সাংবিধানিক ভুল?

অনুচ্ছেদ ৩৫৬ কী?

প্রথমে বুঝে নেওয়া যাক বহুল আলোচিত অনুচ্ছেদ ৩৫৬। ভারতীয় সংবিধানের ১৮ নম্বর ভাগে জরুরি পরিস্থিতি সংক্রান্ত যে বিধানগুলি রয়েছে, সেখানেই রয়েছে অনুচ্ছেদ ৩৫৬- যাকে সাধারণভাবে বলা হয় রাষ্ট্রপতি শাসন।
এই ধারার মূল বক্তব্য হল-
যদি কোনও রাজ্যের সরকার সংবিধান অনুযায়ী শাসন চালাতে ব্যর্থ হয়,
তাহলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে কেন্দ্র সেই রাজ্যের নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করে
রাজ্যের আইনি, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে।
অর্থাৎ, ৩৫৬ মানে সরাসরি কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ।

কোন পরিস্থিতিতে ৩৫৬ জারি করা যায়?

সংবিধান ও সাংবিধানিক নজির অনুযায়ী, কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনুচ্ছেদ ৩৫৬ জারি হতে পারে-
যদি কোনও দল বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে না পারে
মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে ব্যর্থ হলে
অনাস্থা প্রস্তাবে সরকারের পতন ঘটলে
কোনও বিপর্যয়ের কারণে নির্ধারিত সময়ে বিধানসভা নির্বাচন না করা গেলে
রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতির কাছে যদি মনে হয়, সংবিধান মেনে সরকার পরিচালিত হচ্ছে না
অথবা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতি ঘটলে
এই সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতি শাসনের পথ খোলা থাকে

রাষ্ট্রপতি শাসনের মেয়াদ ও ইতিহাস

একবার ৩৫৬ জারি হলেই কি রাজ্যের গণতান্ত্রিক অধ্যায় শেষ? তা নয়।

ছয় মাসের মধ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের সিদ্ধান্ত
সংসদের দুই কক্ষে পাশ করাতে হয়
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সংসদের অনুমোদন নিয়ে মেয়াদ বাড়ানো যায়
রাষ্ট্রপতি চাইলে যে কোনও সময় এই শাসন প্রত্যাহারও করতে পারেন

স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ১৩২ বার দেশে অনুচ্ছেদ ৩৫৬ প্রয়োগ হয়েছে। একসময় দিল্লির সরকার এই ধারাকে প্রায় নিয়মিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত।

এই অপব্যবহারের লাগাম টেনেছিল সুপ্রিম কোর্ট। ১৯৯৪ সালের ঐতিহাসিক এস আর বোমাই বনাম কেন্দ্র সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়-

অনুচ্ছেদ ৩৫৬ শেষ অস্ত্র
তার আগে কেন্দ্রকে অনুচ্ছেদ ৩৫৫ সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ করতে হবে
সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জায়গা বিধানসভা, রাজভবন নয়
এই রায়ের পর থেকেই ৩৫৬ প্রয়োগে আইনি নজরদারি অনেক কঠোর হয়

অনুচ্ছেদ ৩৫৫ কী?

এখন আসা যাক তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ ৩৫৫-এ।
যেখানে ৩৫৬ মানে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া, ৩৫৫ সেখানে বলে রক্ষা ও সহযোগিতার কথা। এই ধারায় বলা হয়েছে-

বাহ্যিক আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা থেকে প্রতিটি রাজ্যকে রক্ষা করা
প্রতিটি রাজ্য যাতে সংবিধান মেনে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করা
এটা কোনও ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটা কেন্দ্রের সাংবিধানিক কর্তব্য
এই ধারার আওতায় কেন্দ্র প্রয়োজনে রাজ্যে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করতে পারে।

৩৫৫-র সীমা ও শর্ত

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা আছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে-

রাজ্য সরকার বা রাষ্ট্রপতির সম্মতি ছাড়া কেন্দ্র একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না
কেন্দ্রীয় বাহিনী এলেও তারা রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের নির্দেশ মেনেই কাজ করে
রাজ্যকে অন্ধকারে রেখে কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রের নেই
অর্থাৎ, ৩৫৫ মানে রাজ্যের ঘাড়ে বসে শাসন নয়।

২০২৬, এসআইআর ও সাংবিধানিক প্রশ্ন

এখন প্রশ্ন উঠছে- ২০২৬ সালে যদি এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হতে দেরি হয় এবং তার ফলে যদি বিধানসভা নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে না হয়, তাহলে কি বাংলায় ৩৫৫ বা ৩৫৬ জারির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে? সংবিধান বলছে- শুধু ভোট পিছোনো নয়,বরং প্রশ্ন হল, রাজ্যে সাংবিধানিক শাসন ভেঙে পড়ছে কি না। আদালত কখনও ৩৫৫ বা ৩৫৬ জারির নির্দেশ দিতে পারে না। আদালত শুধু পরে বিচার করতে পারে- এই প্রয়োগ সাংবিধানিক ছিল কি না। সব মিলিয়ে স্পষ্ট- অনুচ্ছেদ ৩৫৫ ও ৩৫৬ একে অপরের বিকল্প নয়। একটি সহযোগিতার, অন্যটি হস্তক্ষেপের। বাংলার রাজনীতিতে কোনটা বাস্তব হবে, তা ঠিক করবে সংবিধান।