‘আমরা পরস্পর একমত হয়েছি যে অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর থাকলেও প্রজেক্ট ফ্রিডম স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত থাকবে। মূলত শান্তি চুক্তিটি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষর করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : আদৌ কি শান্ত হবে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ? আমেরিকা ,ইজরায়েল ও ইরানের উস্কানিমুলক পদক্ষেপ পকেট ফায়ারিং-এর কাজ করবে। সামান্য অস্থিরতা যা নতুন করে যুদ্ধের দাবানলের কাজ করবে। এবার হরমুজ অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত থাকবে বলে জামালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ড। কেনও? এর পিছনে কি নতুন কোনও সমীকরন কাজ করছে ? সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নিয়ে ঠিক কী জানিয়েছেন ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। তবে এই সময়ও ইরানের ওপর আরোপিত নৌ–অবরোধ পুরোপুরি বহাল থাকবে। ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমরা পরস্পর একমত হয়েছি যে অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর থাকলেও প্রজেক্ট ফ্রিডম স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত থাকবে। মূলত শান্তি চুক্তিটি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষর করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এবার আপনাদের একটু বুঝিয়ে বলি এই প্রজেক্ট ফ্রিডম কি। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ। যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধের মুখে আটকে পড়া প্রায় ২,০০০ বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে বের করে আনা এবং নিরাপত্তা প্রদান করা। এটি মূলত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন ও ইজরায়েলি হামলার পর সৃষ্ট উত্তেজনা কমানোর একটি মানবিক ও কৌশলগত প্রচেষ্টা । যুদ্ধবিরতি চলাকালীন হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এই প্রণালি উন্মুক্ত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে এই নতুন অভিযান ঘোষণার পরই বেশ কয়েকটি সামরিক পদক্ষেপ নেয় ইরান। দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ, অন্য দুটি দেশের জ্বালানিবাহী ট্যাঙ্কার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। যা নিয়ে আমেরিকা ও ইরান একে অপরকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইজরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আরব আমিরাত জানিয়েছে, ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠেকিয়েছে।এছাড়াও ,ইজরায়েল ও আমেরিকা নতুন করে ইরানে যৌথ হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে। এ ক্ষেত্রে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও জ্বালানি কেন্দ্রগুলিতে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। ইজরায়েলের সংবাদমাধ্য়ম সূত্রের খবর, গত মাসে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তার আগেই পরিকল্পনার সিংহভাগ নির্ধারণ করা হয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে কার্যত একাটার পর একটা ঘটনা ঘটেই চলেছে। ট্রাম্প বিপুল সংখ্যক নৌ সেনা, রণতরী ও যুদ্ধবিমান নিয়ে হরমুজ উন্মুক্ত করতে চান। মার্কিন সেনা বাহিনী জানিয়েছে, তাদের অ্যাপাচি ও সিহক হেলিকপ্টারগুলো হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকিস্বরূপ ছয়টি ইরানি নৌকায় হামলা চালিয়েছে। গত সপ্তাহে তাদের বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, এই প্রক্রিয়ায় তাঁকে বাধা দিতে এলে ইরানকে ‘পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেবেন’ বলে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এ প্রেক্ষাপটে ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়েছে। ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ হরমুজ প্রণালিতে যে কোনো উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আমেরিকাকে সতর্ক করেছেন। এই অবস্থায় একের পর এক হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরানের হামলা সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতি শেষ হয়নি। যে কোনও পরিস্থিতিতে নিজেদের রক্ষা করতে তা প্রস্তুত। অর্থাত তাদের আত্মরক্ষাবল মজবুত বলে স্পষ্ট করেন হেগসেথ। চূড়ান্তভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর্যায়ে কিছু ঘটলে প্রেসিডেন্টই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’ আর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, সেনা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি সমস্যার সমাধান হবে না। এদিকে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও হুমকি বন্ধ না করে, তাহলে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইন। এই সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে আলোচনা চলছে।হরমুজ বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা অব্যাহত আছে। অয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ১১১ দশমিক ৪ ডলার, যা আগের দিনের চেয়ে কিছুটা কম।
এককথায় পশ্চিম এশিয়ার এই অস্থিরতা ভারতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। , কারণ এই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন । এছাডা়ও তেল আমদানির জন্য নির্ভরশীল ভারত।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং ভারত সরকার এই পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে ধৈর্যশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা বৃদ্ধি না পায়।