তৃণমূলের ১৫ বছরের দুর্গ ধসে যাওয়ার কারণ হিসেবে একাধিক ইস্যু দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের এই অভাবনীয় ফলাফল এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের একাধিপত্যে বড়সড় ফাটল ধরার নেপথ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণকে চিহ্নিত করছেন।
১. প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতার হাওয়া (Anti-incumbency)
টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে সরকারের বিরুদ্ধে একটি স্বাভাবিক জনবিদ্বেষ বা ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ সময় একদলীয় শাসনে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে একঘেয়েমি বা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জন্মায়, এবারের নির্বাচনে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই প্রভাব বেশি দেখা গেছে।
২. দুর্নীতির অভিযোগ ও কেন্দ্রীয় তদন্ত
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতি—একাধিক ইস্যুতে শাসকদলের হেভিওয়েট নেতাদের জেলবন্দি হওয়া দলের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হেনেছে। ইডি (ED) এবং সিবিআই (CBI)-এর লাগাতার তৎপরতা সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যে, তৃণমূলের নিচুতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত দুর্নীতির শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে।
৩. নিচুতলার কর্মীদের ‘দাদাগিরি’ ও সিন্ডিকেট রাজ
রাজ্যের অনেক জায়গায় স্থানীয় নেতাদের উদ্ধত আচরণ, তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট রাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ভোট দেওয়ার অধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়া বা পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ ভোটারদের শাসকদলের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। “উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে” জাতীয় মন্তব্য আর মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারেনি।
৪. মেরুকরণ ও হিন্দু ভোটব্যাঙ্কে ধস
বিজেপির তীব্র হিন্দুত্ববাদী প্রচার এবং রামমন্দির আবেগের জোয়ারে রাজ্যের হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের একটি বড় অংশ তৃণমূলের হাতছাড়া হয়েছে। মতুয়া সমাজ থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ভোট—অনেক ক্ষেত্রেই শাসকদল পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বিরোধীদের অভিযোগ ছিল যে তৃণমূলের ‘তোষণ রাজনীতি’ সংখ্যাগুরু ভোটকে একত্রিত হতে সাহায্য করেছে।
৫. কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের অভাব
যুব সমাজের মধ্যে কর্মসংস্থান নিয়ে ব্যাপক হতাশা ছিল এই ফলের অন্যতম বড় কারণ। রাজ্যে বড় কোনো শিল্প না আসা এবং সরকারি চাকরির পরীক্ষায় স্বচ্ছতার অভাব শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে বিকল্পের খোঁজে বাধ্য করেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো জনমোহিনী প্রকল্পগুলো মহিলাদের একাংশকে টানতে পারলেও, কর্মসংস্থানের দাবিতে সোচ্চার যুবকদের ভোট শাসকদলের বিরুদ্ধেই গেছে।
এই পাঁচটি কারণের সম্মিলিত প্রভাবে তৃণমূলের দুর্ভেদ্য দুর্গে ধস নেমেছে। সাধারণ মানুষ প্রকল্পের সুবিধা নিলেও, দিনের শেষে স্বচ্ছ শাসন এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।