২০২৬ অর্থবর্ষের তৃতীয় ত্রৈমাসিকের হিসেব বলছে- সংস্থা এখন মুনাফার পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাহলে কি বৈদ্যুতিক দু’চাকার বাজারে নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : একসময় ইলেকট্রিক দু’চাকার বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল একটি নাম। কিন্তু সেই আলোচনার সঙ্গে ছিল প্রশ্ন, সমালোচনা, এমনকি ছিল লোকসানের চাপও। তবে ২০২৬ সালে এসে ছবিটা কি বদলাতে শুরু করেছে? খরচ কমিয়ে, পরিষেবা উন্নত করে এবং প্রযুক্তিতে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে Ola Electric। ২০২৬ অর্থবর্ষের তৃতীয় ত্রৈমাসিকের হিসেব বলছে- সংস্থা এখন মুনাফার পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাহলে কি বৈদ্যুতিক দু’চাকার বাজারে নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে?
দু’চাকার বাজারে মন্দা ও ওলার চ্যালেঞ্জ
গত এক বছরে ভারতের দু’চাকার বাজারে চাহিদা কমার প্রবণতা স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে ইলেকট্রিক সেগমেন্টে গ্রাহকদের মধ্যে একদিকে যেমন আগ্রহ ছিল, অন্যদিকে ছিল চার্জিং অবকাঠামো, ব্যাটারির স্থায়িত্ব এবং পরিষেবা নিয়ে নানা প্রশ্ন। এই পরিস্থিতিতে ওলা ইলেকট্রিককেও পড়তে হয় চাপে। উচ্চ খরচ, পরিষেবা সংক্রান্ত অভিযোগ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে সংস্থার অপারেশনাল খরচ একসময় আকাশ ছুঁয়েছিল।
২০২৫ অর্থবর্ষের শেষ ত্রৈমাসিকে সংস্থার অপেক্স দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। ফলে ব্যবসার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল শিল্প মহলেও।
খরচ কমিয়ে মুনাফার পথে হাঁটা
২০২৬ সালে এসে সেই ছবিটাই বদলানোর চেষ্টা করেছে সংস্থা। নতুন ব্যবসায়িক কৌশল অনুযায়ী অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে কার্যক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলাফলও এসেছে দ্রুত। ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকের শেষে ওলা ইলেকট্রিকের গ্রস মার্জিন দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় যা ১৫.৭ শতাংশ বেশি। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলেকট্রিক দু’চাকার বাজারে এই মার্জিন কার্যত রেকর্ড। বর্তমানে অপারেশনাল খরচ নামিয়ে আনা হয়েছে ৪৮৪ কোটিতে। সংস্থার লক্ষ্য, আগামী দিনে এই খরচ আরও কমিয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটির মধ্যে রাখা। এর ফলে এখন মাসে প্রায় ১৫ হাজার গাড়ি বিক্রি হলেই সংস্থা ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে পৌঁছে যেতে পারবে।
উৎপাদন ও পরিকাঠামো- ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
ওলার দাবি, তাদের বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থায় ক্ষমতা চার গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ বাজারে চাহিদা বাড়লেই দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তামিলনাড়ুর গিগাফ্যাক্টরিতে ব্যাটারি সেলের উৎপাদন ইতিমধ্যেই দ্বিগুণ করা হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘৪৬৮০ ভারত সেল’ এখন গ্রাহকদের গাড়িতে ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর ফলে ব্যাটারির দক্ষতা, খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার- তিন ক্ষেত্রেই উন্নতির আশা করছে সংস্থা।

পরিষেবা নিয়ে অভিযোগ কমানোর চেষ্টা
একসময় ওলার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল সার্ভিস নিয়ে। ডেলিভারির পর সমস্যার সমাধান পেতে দীর্ঘ সময় লাগত বলে অভিযোগ করেছিলেন বহু গ্রাহক। এই পরিস্থিতি বদলাতে ‘হাইপারসার্ভিস’ কর্মসূচি চালু করেছে সংস্থা। তাদের দাবি, এখন প্রায় ৮০ শতাংশ অভিযোগ একই দিনেই সমাধান করা হচ্ছে। বকেয়া পরিষেবার চাপও কমেছে প্রায় অর্ধেক। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভি বাজারে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে গেলে শুধু প্রযুক্তি নয়, পরিষেবার মানই শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের আস্থা তৈরি করে।
বিক্রি ও আয়ের হিসেব
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর- এই তিন মাসে মোট ৩২,৬৮০টি গাড়ি গ্রাহকদের হাতে তুলে দিয়েছে ওলা। এই সময় সংস্থার মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা। সংস্থার বক্তব্য, এই ত্রৈমাসিক আসলে তাদের জন্য একটি ‘রিসেট’- অর্থাৎ নতুন করে শুরু করার সময়।
ইভি বাজারে প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যৎ
ভারতে ইলেকট্রিক দু’চাকার বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। সরকারি ভর্তুকি, জ্বালানির বাড়তি দাম এবং পরিবেশ সচেতনতা- সব মিলিয়ে ইভির চাহিদা বাড়ছে। তবে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে সমান তালে। নতুন নতুন সংস্থা বাজারে প্রবেশ করছে, পুরনো নির্মাতারাও ইলেকট্রিক সেগমেন্টে জোর দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে খরচ নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং পরিষেবার মান- এই তিনটিই নির্ধারণ করবে কে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকবে।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বলা যায়, ওলা ইলেকট্রিক এখন আর শুধু দ্রুত সম্প্রসারণের গল্প বলছে না। বরং সংস্থা এখন স্থায়ী ব্যবসায়িক মডেল তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে। খরচ কমানো, দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রাহক পরিষেবায় জোর- এই তিন স্তম্ভের উপর ভর করেই মুনাফার পথে এগোতে চাইছে সংস্থা। ভারতের ইভি বিপ্লবের পরবর্তী অধ্যায়ে ওলা কতটা বড় ভূমিকা নিতে পারে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েকটি ত্রৈমাসিকের পারফরম্যান্সের উপর। তবে ইঙ্গিত স্পষ্ট- মন্দার মেঘ কাটিয়ে আবারও গতি ফেরানোর লড়াই শুরু করেছে ওলা। ব্যুরো রিপোর্ট আর প্লাস নিউজ।