বিধ্বংসী ক্রুজ মিসাইল ‘বুরেভেস্তনিক’-এর সফল পরীক্ষা করল রাশিয়া
রিমা দত্ত, সাংবাদিক: আগামী ফ্রেব্রুয়ারীতে পাঁচ বছর পূর্ণ হবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বার বার পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনা করেও যুদ্ধ থামাতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনও সমঝোতাই হয়নি। সম্প্রতি হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে ট্রাম্প ও পুতিনের একটি বৈঠক হতে পারে বলে জল্পনা চলছিল। কিন্তু তাও শেষ পর্যন্ত হয়নি। যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি চুক্তি করা হবে, এই আশ্বাস পেলেই ট্রাম্প পুতিনের মুখোমুখি বসতে রাজি, নচেৎ নয়। আর এই নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে পুতিনের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে দেখা গেছে। আর এই আবহেই বিধ্বংসী ক্রুজ মিসাইল ‘বুরেভেস্তনিক’-এর সফল পরীক্ষা করল রাশিয়া। ২০১৮-তে বুরে-ভেস্ত-নিক’ মিসাইলের আত্মপ্রকাশের সময় থেকেই মার্কিন ও ইউরোপের তাবড় গোয়েন্দারা এর উপর নজর রাখছিলেন। প্রথাগত টার্বো ফ্যান বা টার্বো জেট নয়, নতুন মিসাইলে ব্যবহৃত হয়েছে ‘নিউক্লিয়ার প্রপালশান’। অন্যান্য মিসাইলের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি উড়তে পারে না, তাই অনেকটা দূরে হামলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু নয়া রুশ ক্ষেপণাস্ত্র অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য উড়তে পারবে ২০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি।

একটানা আকাশে উড়তে পারে ১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। হামলা করতে পারে ১৪ হাজার কিলোমিটার দূরের টার্গেটে। চলতি সপ্তাহেই এমন ভয়ঙ্কর ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া সেরে ফেলল ক্রেমলিন। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন রবিবার সরকারি ভাবে ঘোষণাও করে দিলেন, গোটা দুনিয়ায় আর দ্বিতীয় কোনও দেশের কাছে এমন শক্তিশালী পরমাণু মিসাইল নেই। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন বছরের মধ্যে এমন এক পারমাণবিক শক্তিধর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ঘোষণা করল ক্রেমলিন, যার ভয়াবহতার কাছে হিরোশিমা-ও হার মানবে। চলতি সপ্তাহেই মস্কো পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সেরে ফেলল, ‘নাইন এম-৭৩০ বুরেভেস্তনিক’ মিসাইলের, যার ডাক নাম ‘স্টর্ম পেট্রেল’। নয়া মিসাইলের নামকরণ করা হয়েছে এক ছোট সামুদ্রিক পাখির নাম অনুসারে। ভোটাভুটির মাধ্যমে এই নাম ঠিক হয়েছে। স্টর্ম পেট্রেল দীর্ঘক্ষণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে উড়তে পারে, সবরকম পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। নয়া রুশ মিসাইলের সঙ্গে এই পাখির চরিত্রের অনেক মিল। এখন এই রুশ মিসাইলের কাজ কী?
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নয়া রুশ মিসাইল উড়তে পারে ১৪,০০০ কিলোমিটার
১৫ ঘণ্টা ধরে আকাশে উড়তে সক্ষম
বর্তমান ও ভবিষ্যতের কোনও ডিফেন্স সিস্টেম এই মিসাইলকে কাবু করতে পারবে না
পুতিনের দাবি, এই মিসাইল যুদ্ধে ‘অপরাজেয়’
মস্কোর দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে নতুন মিসাইল বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে নিজের টার্গেটে একশো শতাংশ সাফল্যের সঙ্গে হামলায় সক্ষম। রবিবার সামরিক পোশাক পরে পুতিন সাংবাদিক বৈঠকে একথা ঘোষণা করতেই, ন্যাটো-সহ ইউরোপীয় দেশগুলি আশঙ্কায় ভুগতে শুরু করে দিয়েছে। ন্যাটো এই মিসাইলের ডাক নাম রেখেছে স্কাই-ফল। মিসাইলটি পরীক্ষার দিন মস্কো থেকে ৪৭৫ কিলোমিটার দূরের ‘টেস্টিং সাইটে’ নজর রেখেছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারাও। সে খবর জেনেই সম্ভবত রুশ সেনাপ্রধান রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত সেনাঘাঁটিও এই মিসাইলের হামলার আওতায় পড়বে। দ্রুতই নতুন মিসাইলকে রুশ সেনার ভাঁড়ারে যুক্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।
২০১৮-তে বুরেভেস্তনিক’ মিসাইলের আত্মপ্রকাশের সময় থেকেই মার্কিন ও ইউরোপের তাবড় গোয়েন্দারা এর উপর নজর রাখছিলেন। প্রথাগত টার্বো ফ্যান বা টার্বো জেট নয়, নতুন মিসাইলে ব্যবহৃত হয়েছে ‘নিউক্লিয়ার প্রপালশান‘। অন্যান্য মিসাইলের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি উড়তে পারে না, তাই অনেকটা দূরে হামলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু নয়া রুশ ক্ষেপণাস্ত্র অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য উড়তে পারবে ২০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি ও যে কোনও সময় নির্দেশমাফিক হামলা করতে পারবে। এটিই হল বিশ্বের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র যা বিশ্বের যে কোনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করতে সক্ষম। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবি,
নয়া মিসাইল কয়েক টনের পরমাণু বোমা বহন করেও গোটা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পারে
মার্কিন মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমকেও বোকা বানাতে পারবে
যে কোনও উচ্চতায় বা গভীর সুড়ঙ্গেও পরমাণু বোমা ফেলে আসতে পারে
মানচিত্রেও লুকানো, এমন সুরক্ষিত ঘাঁটিতেও হামলা করতে পারে
৩৫০ ফুট উঁচুতে শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিতে উড়তে পারে বলে রেডারে ধরা পড়ে না

ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে নানাভাবে রাশিয়াকে নিরস্ত করতে চাইছেন মার্কিন-প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কখনও ভারতকে রাশিয়ার থেকে তেল কিনতে মানা করছেন। আবার কখনও ইউক্রেনকে যুদ্ধে টিকে থাকতে অস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। একতরফা, অন্যায্য শুল্ক চাপিয়েছেন। সম্প্রতি দুটি বৃহত্তম রুশ তেল সংস্থার উপরেও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছেন। কিন্তু কোনও বহিরাগত শক্তির কাছে যে মস্কো মাথা নোয়াবে না, সেটা রবিবারও স্পষ্ট করে দিলেন পুতিন। সেনাপ্রধানকে পাশে বসিয়ে নয়া মিসাইল পরীক্ষায় সাফল্যের খবর জাতীয় টিভিতে ভাগ করে নিলেন দেশবাসীর সঙ্গে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্রেমলিনে বসেই যে এখন ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে পরমাণু হামলা করা যায়, তারই আগাম বার্তা এদিন দিয়ে রাখলেন পুতিন। প্রেসিডেন্ট পুতিন জানান,
‘৯এম৭৩০ বুরেভেস্তনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ‘অপরাজেয়’
গতিপথ অনিশ্চিত ও পাল্লা প্রায় সীমাহীন
এটি এমন এক অস্ত্র, যা বিশ্বের আর কোনো দেশের কাছে নেই
অবিলম্বে এই মারণাস্ত্র মোতায়েন করারও নির্দেশ দিয়েছেন পুতিন’
সাধারণত বিশ্বের অন্যান্য ক্রুজ মিসাইল জেট ইঞ্জিনের উপর নির্ভরশীল। তবে বুরেভেস্তনিক সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কম্প্যাক্ট নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর দিয়ে সজ্জিত। এই রিঅ্যাক্টর বাতাসকে অত্যন্ত উত্তপ্ত করে, যা ক্ষেপণাস্ত্রটিকে প্রসারিত করে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি পারমাণবিক জ্বালানিসম্পন্ন, যার ফলে এই ক্ষেপণাস্ত্র একাধিকবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে সক্ষম। একইভাবে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে হামলা চালাতে সক্ষম। তবে কি এই সব দেখে কি ভয় পাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন? ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ওয়াশিংটন-মস্কো টানাপড়েনের মধ্যেই আমেরিকার সঙ্গে প্লুটোনিয়াম চুক্তি বাতিল করলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ঘটনাচক্রে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার উপকূলের অদূরেই পরমাণু অস্ত্রবহনে সক্ষম ডুবোজাহাজ মোতায়েনের কথা ‘মনে করানোর’ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই বার্তা এল পুতিনের তরফে।
আমেরিকা-রাশিয়া পরমাণু অস্ত্র প্রসাররোধের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জমানায় ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত এই সংশোধিত চুক্তি। ২০০০ সালে প্রথম প্লুটোনিয়াম সমঝোতা হয়েছিল দু’দেশের। সোমবার পুতিন প্লুটোনিয়াম নিষ্কাশন এবং মজুত সংক্রান্ত ওই চুক্তি বাতিলের নির্দেশনামায় সই করেছেন বলে রুশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য মস্কো টাইমস’ জানিয়েছে। প্রসঙ্গত, আমেরিকায় প্রায় ৯০ টন অস্ত্রনির্মাণে সক্ষম প্লুটোনিয়াম রয়েছে। রাশিয়ার রয়েছে ১২৮ টন।
এর পরে রবিবার পুতিন জানান, তাঁরা পরমাণু অস্ত্রবহনে সক্ষম ‘বুরেভেস্তনিক’ ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের সফল ভাবে পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেছেন। মস্কোর দাবি, যে কোনও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্র। পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে ‘বুরেভেস্তনিক’ ১৪ হাজার কিলোমিটারের (৮,৭০০ মাইল) দূরত্ব পাড়ি দিয়েছে বলে দাবি মস্কোর। রাশিয়ার এই দাবির পরই সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। উত্তরে তিনি জানান, আমেরিকার এত দূরপাল্লায় পা়ড়ি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, রাশিয়ার উপকূলের কাছেই তাঁদের পরমাণু অস্ত্রবহনে সক্ষম ডুবোজাহাজ রয়েছে। তার পরেই চুক্তি বাতিলের বার্তা দিল মস্কো।