‘দাঙ্গা কোথায়?’ সরাসরি চ্যালেঞ্জ নওশাদের

ভাঙড় থেকে বারুইপুর পর্যন্ত দীর্ঘ শোভাযাত্রায় শক্তি প্রদর্শন ভাঙড়ের আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকীর।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : শনিবার দুপুরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক ময়দানে নজরকাড়া শক্তি প্রদর্শন করলেন ভাঙড়ের আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকী। ভাঙড় থেকে বারুইপুর পর্যন্ত দীর্ঘ শোভাযাত্রা করে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে বারুইপুরের এসডিও অফিসে পৌঁছে মনোনয়নপত্র জমা দেন তিনি। মিছিল ঘিরে এলাকাজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ, পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তেজনাও ছিল চোখে পড়ার মতো।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আত্মবিশ্বাসী সুরে নওশাদ সিদ্দিকী বলেন, “২০২১ সালে মানুষের ভোট নিয়ে আমরা বিধানসভায় গিয়েছি। গত পাঁচ বছর ধরে বিধানসভায় সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। আজ মানুষের সমর্থন আরও বেশি করে আমাদের দিকে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি—এবারও আমরা জয়ের সার্টিফিকেট নিয়ে ফিরব।”
তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০২১ সালের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত কঠিন লড়াই। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে বলে দাবি তাঁর। তাঁর কথায়, “গতবার লড়াই ছিল টাফ। কিন্তু এবারের লড়াই তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। কারণ বিরোধীরা এখন বিভক্ত। বিজেপি ও তৃণমূল—এই দুই শক্তির মধ্যে যে আলাদা অবস্থান দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে মানুষ বুঝে গেছে বিষয়টা।”
ভাঙড় অঞ্চলে আইএসএফের অবস্থান আরও মজবুত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ উন্নয়নের পক্ষে একজোট হয়েছে বলে তাঁর দাবি। মুসলিম, খ্রিস্টান থেকে শুরু করে ওবিসি—সব সম্প্রদায়ের মানুষ এখন বিকল্প শক্তির দিকে তাকিয়ে আছে বলেই মনে করছেন তিনি। “মানুষ আর পুরনো প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করছে না, তারা পরিবর্তন চায়,” বলেন নওশাদ।
এবারের নির্বাচনে ‘ডাবল মার্জিনে’ জয়ের আশাবাদও ব্যক্ত করেন আইএসএফ প্রার্থী। তাঁর মতে, “মানুষের যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়েছে। মাঠে-ময়দানে যে সমর্থন দেখছি, তাতে আমরা নিশ্চিত—ফল আমাদের পক্ষেই যাবে।”
তবে শুধুমাত্র নির্বাচনী প্রচার নয়, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা নিয়েও সরব হন তিনি। বিশেষ করে ‘দাঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নওশাদ সিদ্দিকী। তাঁর বক্তব্য, “আজকাল খুব সহজেই ‘দাঙ্গা’ শব্দটা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু দাঙ্গা কাকে বলে? কয়েকজন মানুষ যদি নিজেদের দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করেন, সেটাকে কি দাঙ্গা বলা যায়? এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ।”
তিনি অন-ক্যামেরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, “যদি সত্যিই কোথাও দাঙ্গা হয়ে থাকে, তাহলে তার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হোক। কোথায়, কখন, কীভাবে ঘটনা ঘটেছে—মানুষকে দেখানো হোক। আমার যতটুকু জানা, এমন কোনও ভিডিও নেই। বরং একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে অন্যভাবে দেখানোর চেষ্টা চলছে।”
এক্ষেত্রে সুজাপুরের একটি ঘটনার সঙ্গেও বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। “সুজাপুরের ঘটনা এবং এই ঘটনাকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। সেখানে কোনও ভিডিও অফিস ঘেরাও বা দীর্ঘক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখার মতো ঘটনা ঘটেনি। এই দুই ঘটনাকে এক করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে,” বলেন নওশাদ। তিনি মিডিয়ার প্রতিও আবেদন জানান—যাচাই না করে কোনও তথ্য প্রচার না করার জন্য।
একইসঙ্গে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে দীর্ঘক্ষণ ধরে সাধারণ মানুষ তাদের দাবি জানালেও সমস্যার সমাধান হয়নি। “বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনও সমাধান আসেনি। এরপর হঠাৎ লাঠিচার্জ করা হয়—এমন অভিযোগ উঠেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ ও মহিলা পুলিশও আহত হন,” দাবি করেন তিনি।
এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও তোলেন আইএসএফ প্রার্থী। তাঁর বক্তব্য, “ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হোক, কে কোথায় ছিল, কীভাবে ঘটনা ঘটল—সব পরিষ্কার হওয়া দরকার। সাধারণ মানুষের কথাও শোনা উচিত।”
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। “যদি ভুল তথ্যের ভিত্তিতে মন্তব্য করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই রিপোর্ট কে পাঠিয়েছে, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কখনোই কাম্য নয়,” বলেন তিনি।
ভাঙড়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, “মানুষ ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—তারা কোনও অপরাধী বা দুষ্কৃতীকে সমর্থন করবে না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই তারা নিজেদের মতামত জানাবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাশাপাশি একাধিক এলাকায় আইএসএফ ভালো ফল করবে। “আরাবাদি ইসলামপুর, ক্যানিং পশ্চিম, বারুইপুর, বাসন্তী, মিনাখা, বারাসাত, দেগঙ্গা, যাদবপুর—সব জায়গাতেই আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী,” বলেন তিনি।
শেষে গণতন্ত্র রক্ষার বার্তা দিয়ে নওশাদ সিদ্দিকী বলেন, “গণতন্ত্র মানে মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার। সেই অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। আমরা শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করছি। আমরা কোনও ভয় পাই না, কোনও চাপে মাথা নত করি না। সত্য সামনে আসুক—মানুষই তার বিচার করবে।”