আর কোন কোন রাজ্যে ভোট ?

প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রশ্নে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা।

শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : ৯ এপ্রিল দক্ষিণ ভারতের কেরল, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে বিধানসভা ভোট। একই দিনে ভোট অসমেও। অন্যদিকে তামিলনাড়ুতে ভোট আগামী ২৩ এপ্রিল। এ প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রশ্নে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা।

কেরলঃ
কেরালায় লাল দুর্গ কি অটুট থাকবে, নাকি বদলের হাওয়া বইছে সেই রাজ্যে। একদিকে রয়েছে এলডিএফের ক্ষমতা ধরে রাখা অন্যদিকে ইউডিএফের প্রত্যাবর্তন, যুযুধান দুই পক্ষের মধ্যে হাজির হয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ। জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ভোট শেয়ারের হিসাবে এলডিএফ এবং ইউডিএফ সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছে। তবে বেশ খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে এনডিএ। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ২০ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি এবার বড় চ্য়ালেঞ্জ কেরলে।
কেরলে বর্তমানে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা এলডিএফ ক্ষমতায় রয়েছে। সিপিএম নেতা পিনারাই বিজয়ন এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ২০২৬ সালের কেরল বিধানসভা নির্বাচন বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা-র জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে। কারণ বিরোধী কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট স্থানীয় নির্বাচনে ভালো ফল করেছে। অন্যদিকে বিজেপি রাজ্যে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন দাবি করেছেন, রাজ্যে সরকার বিরোধী হাওয়া নেই এবং তাঁরা ভালো ফল করবে। তবুও দুর্নীতির অভিযোগ, আর্থিক সংকট এবং গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়নের ঘাটতি নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

তিরুবনন্তপুরম কর্পোরেশন এবং কিছু পঞ্চায়েতে বিজেপির জয় এবং ভালো ভোটপ্রাপ্তি, এলডিএফ-এর দ্বিমুখী লড়াইয়ের সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছে।
রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি করেছে।
রাজ্য সরকারের আর্থিক পরিস্থিতি এবং কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালানোর ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী পি বিজয়ন এই দাবি অস্বীকার করেছেন।
এলডিএফ সরকার তাদের ব্যাপক পরিকাঠামো উন্নয়ন ও জনমুখী প্রকল্পের ওপর ভরসা করছে। অন্যদিকে বিরোধীরা ওয়েনাড ভূমিধসের ত্রাণ তহবিল নয়ছয় এবং অন্যান্য দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরকারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
১৪০ সদস্যের কেরল বিধানসভায় ২০২১ সালে এলডিএফ ৯৯টি আসন জিতেছিল। যেখানে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউডিএফ-কে মাত্র ৪১ টি আসন পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। এখানে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাওয়া বিজেপি একটি আসনও জিততে পারেনি।
স্থানীয় ভোটের প্রবণতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, এলডিএফ-কে এই লড়াইয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এবারের ভোটে পিনারাই বিজয়ন হ্যাটট্রিক করছেন, না উল্টে যাবে পাশা তার উত্তর দেবে সময়।

অসমঃ
অসমে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা এবং তাঁর স্ত্রী-র তিন পাসপোর্ট বিতর্ক এখন রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। কংগ্রেস নেতা পবন খেড়ার দাবি অনুযায়ী রিনিক ভূঞা শর্মার সংযুক্ত আরব আমিরশাহি গোল্ডেন কার্ড এবং পাসপোর্ট রয়েছে। এছাড়া অ্যান্টিগুয়া, বার্বুড ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং মিশরের পাসপোর্ট রয়েছে রিনিকের নামে বলে দাবি করেছেন কংগ্রেস নেতা পবন। যদিও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং বিজেপি এই সমস্ত অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
এর পাশাপাশি অসমে রয়েছে অনুপ্রবেশ এবং সিএএ ইস্যু। ২০২৬ অসম বিধানসভা নির্বাচন বিজেপির কাছে তৃণমূল স্তরে সাংগঠনিক শক্তি বজায় রেখে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতা ধরে রাখার এক বড় চ্য়ালেঞ্জ। যদিও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার জনপ্রিয়তা এবং দলবদলু নেতাদের অন্তর্ভুক্তির ফলে বিজেপি শক্তিশালী হলেও, উপরি অসমে জাতিগত পরিচয় এবং ছয়টি জনজাতির এসটি স্ট্যাটাস নিয়ে অসন্তোষ তাদের বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও যে চ্যালেঞ্জগুলি বিজেপির সামনে উঠে এসেছে তা হল অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও দলবদল। দলের টিকিট না পেয়ে অনেকেই নির্দল হয়ে লড়ছেন। যা এনডিএ-র আসন সংখ্যা কমাতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
তাই-আহোম, মরান, মটক, চুটিয়া, কোচ-রাজবংশী ও চা জনজাতির মানুষজন তপশিলি উপজাতি তকমা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ।
কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী জোট আহোম পরিচয় ও স্থানীয় ইস্যুগুলিকে হাতিয়ার করে বিজেপিকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছে।
অসমে এনডিএ-র পালে হাওয়ার কিছু কারণের মধ্যে অন্যতম মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। তাঁর অরুণোদয় প্রকল্পের মতো সামাজিক সুরক্ষা পরিকল্পনাগুলি মহিলাদের মধ্য যথেষ্ট জনপ্রিয়।
এবারের নির্বাচনে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ, অসম গণ পরিষদ এবং ইউপিপিএল জোটবদ্ধভাবে লড়ছে।
সামগ্রিকভাবে, অসম নির্বাচন বিজেপির জন্য টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতা ফেরার লড়াই হলেও, জনমত সমীক্ষা বলছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে এনডিএ। তবে জুবিন গর্গের অকালমৃত্যু, অনুপ্রবেশকারী সমস্যা বড় ফ্যাক্টর অসমে।

তামিলনাড়ুঃ

২৩ এপ্রিল তামিলনাড়ুর ভোট। তার আগে নির্বাচনী উত্তাপে ফুটছে দক্ষিণের এই রাজ্য। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন এবং বিরোধী এডিএমকে প্রধান পালানিস্বামীর টক্কর সমানে সমানে। অন্যদিকে কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছেন অভিনেতা কাম রাজনীতিক টিভিকে প্রধান থলপতি বিজয়।
আগের বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রাখলে মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গদি ওল্টানো তামিলনাড়ুতে কিন্তু এবার পাল্লা ভারী বিরোধী এডিএমকের।
উত্তরের মেজাজ আলাদা হতে পারে, কিন্তু দাক্ষিণাত্যের এই মহাযুদ্ধের পারদ এখন তুঙ্গে। ২০২৬ এর তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন এখন স্রেফ একটি লড়াই নয়, বরং টানটান উত্তেজনার ব্লকব্লাস্টার মুভি। সার্ভে অনুযায়ী লড়াই এখন মূলত দুই দ্রাবিড় শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তৃতীয় শক্তি হিসাবে সুপারস্টার বিজয়ের উপস্থিতি কোনওভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
তামিলনাড়ুর ভোটারদের কাছে এবারের নির্বাচনে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক এবং অ্যালকোহল সমস্যা. আইন শৃঙ্খলার অবনতি এবং নারী নিরাপত্তা। এছাড়াও বর্তমান বিধায়কদের প্রতি মানুষের চরম অসন্তোষ শাসক শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

১৯৬৭ সাল থেকে তামিলনাড়ুর রাজনীতি মূলত ডিএমকে এবং এডিএমকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই দুই দলই পালা করে রাজ্যের ক্ষমতায় এসেছে। টিভিকে এনডিএ-র সঙ্গে জোট বাঁধার যে জল্পনা চলছে, তাতে ভোটের উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

স্ট্যালিন কি পারবেন তাঁর দ্রাবিড় মডেল দিয়ে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরতে? নাকি এডিএমকে এবং বিজেপি জোট জয়ললিতার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করবে? তামিল রাজনীতির এই রোমাঞ্চকর ক্লাইম্যাক্সের জন্য অপেক্ষা এখন ৪ মের।

পুদুচেরিঃ
ভোট যুদ্ধের ময়দানে সবথেকে আন্ডাররেটেড পুদুচেরি বিধানসভা নির্বাচন। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তাই খুব একটা হইচই নেই পুদুচেরির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এই ছোট কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে, যেখানে প্রতিটি আসনই গুরুত্বপূর্ণ।
৩০ আসনের একটি ছোট প্রতিযোগিতায় ভোটারদের পছন্দ বা ভোটদানের হারে সামান্য পরিবর্তনও একাধিক আসনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।
পুদুচেরিতে এন রাঙ্গাস্বামীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা এনডিএ জোট ক্ষমতায় রয়েছে। ২০২১ সালের মে মাস থেকে AINRC এবং বিজেপি জোট সরকার ওই রাজ্য শাসন করছে। ছোট্ট এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটাররা কোন দিকে টার্ন নেন, তার জন্য অপেক্ষা ৪ মে পর্যন্ত।