কোর্টে মুখ ভোঁতা ট্রাম্পের, শুল্কে নয়া কৌশল !

ট্রাম্পের ঘোষণা- “আমি স্বাক্ষর করছি ১০ শতাংশ বিশ্বব্যাপী শুল্কে।”

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন নিজেই এক বজ্রপাত। একদিকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের কড়া রায়- প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তে আমদানি শুল্ক আরোপ বেআইনি। অন্যদিকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওভাল অফিস থেকে পাল্টা বার্তা- “আরও ১০ শতাংশ গ্লোবাল ট্যারিফ।” আইন বনাম নির্বাহী ক্ষমতা। সংবিধান বনাম রাজনৈতিক সংকল্প। আদালতের রায় বনাম প্রেসিডেন্টের ঘোষণা। মার্কিন ইতিহাসে বিরল এক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার, প্রধান বিচারপতি জন রবার্ট-এর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়- জরুরি অবস্থার অজুহাতে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে বিশাল শুল্ক আরোপ করা যায় না। কিন্তু রায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্পের ঘোষণা- “আমি স্বাক্ষর করছি ১০ শতাংশ বিশ্বব্যাপী শুল্কে।” এ কি আদালতের রায়ের কার্যত চ্যালেঞ্জ? না কি রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন? বিশ্ববাজারে উদ্বেগ, ওয়াশিংটনে উত্তেজনা আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা। চলুন জেনে নেওয়া যাক- আইন, অর্থনীতি আর রাজনীতির এই ত্রিমুখী সংঘর্ষের পূর্ণ বিশ্লেষণ।

সুপ্রিম কোর্টের রায়

শুক্রবার, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রোবার্টস-এর নেতৃত্বাধীন ৯ বিচারপতির বেঞ্চ ট্রাম্পের শুল্কনীতি পর্যালোচনা করে। ভোটাভুটির ফল ৬-৩। অর্থাৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি মনে করেছেন- জরুরি অবস্থার অজুহাতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের এককভাবে বিশাল অঙ্কের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নেই। প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় বলেন- এটি ক্ষমতার অপব্যবহার। এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম স্তম্ভকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

ট্রাম্পের পাল্টা ঘোষণা

কিন্তু রায়ের পর ট্রাম্প থামেননি। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম Truth Social-এ তিনি লেখেন-

ওভাল অফিস থেকে সমস্ত দেশের উপর ১০ শতাংশ বিশ্বব্যাপী
শুল্ক আরোপের চুক্তিতে স্বাক্ষর করা তাঁর জন্য “সম্মানের”
তিনি ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ১২২ নম্বর ধারা উল্লেখ করেন
এই ধারার অধীনে স্বাভাবিক শুল্কের উপর ১০% অতিরিক্ত
গ্লোবাল ট্যারিফ আরোপের ঘোষণা করেন

এমনকি হুঁশিয়ারি দেন- প্রয়োজনে আরও বেশি শুল্ক বাড়াতে পারেন।

আইনি জটিলতা

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ১২২ নম্বর ধারা সীমিত সময়ের জন্য কার্যকর। সর্বোচ্চ ১৫০ দিন এই শুল্ক চালু রাখা যাবে। তারপর তা বহাল রাখতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে। অর্থাৎ, আদালতের রায়ের পর ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ আইনি লড়াইয়ের নতুন অধ্যায় শুরু করল। এখন প্রশ্ন- আদালত শুল্ককে বেআইনি বলেছে, তাহলে এতদিন যে বিপুল অর্থ আদায় হয়েছে, তা কি ফেরত দিতে হবে?

টাকা ফেরতের প্রশ্ন

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আমদানি শুল্ক বাবদ ট্রাম্প প্রশাসনের আয় হয়েছে প্রায় ১৩.৩৫ হাজার কোটি ডলার। সুপ্রিম কোর্ট রায়ে শুল্ক বেআইনি বললেও- টাকা ফেরতের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে:


টাকা নিজে থেকে ফেরত আসবে না
সংস্থাগুলিকে আলাদা করে মামলা করতে হবে
বিষয়টি নিম্ন আদালত বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতে যেতে পারে

ইতিমধ্যেই হাজারের বেশি সংস্থা আইনি লড়াই শুরু করেছে। এই প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন- “আগামী পাঁচ বছর ধরে আমাদের সকলকে কোর্টের চক্কর কাটতে হবে।”

রাজনৈতিক বার্তা

অনেকেই মনে করছেন, আদালতের রায়ের পর ১০% অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বার্তা। ট্রাম্প বরাবরই “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে জোর দিয়েছেন। শুল্ক ছিল তাঁর অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। সুপ্রিম কোর্টের রায় তাঁর সেই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেছে। পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করে তিনি নিজের সমর্থক ঘাঁটিকে বার্তা দিতে চেয়েছেন- তিনি পিছু হটছেন না।

ভারতের প্রসঙ্গ

এই উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প আশ্বস্ত করেছেন- ভারতের সঙ্গে চুক্তি অপরিবর্তিত থাকবে। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসা করে বলেন- ভারতের সঙ্গে “ন্যায্য চুক্তি” হয়েছে। অর্থাৎ, ভারত আপাতত সরাসরি প্রভাবের বাইরে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বহু দেশ ও বহুজাতিক সংস্থা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। যদি কংগ্রেস অনুমোদন না দেয়, তাহলে ১৫০ দিনের মধ্যেই নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হতে পারে।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট একদিকে সংবিধান ও ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট করল। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেখালেন- তিনি সংঘর্ষের পথেই হাঁটবেন। এখন দেখার কংগ্রেস কী সিদ্ধান্ত নেয়, নিম্ন আদালত টাকা ফেরতের বিষয়ে কী বলে এবং এই শুল্ক যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে কোথায় নিয়ে যায়? একটি রায় এবং ট্রাম্পের একটি পাল্টা ঘোষণা থেকেই শুরু হয়ে গেল নতুন রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই।