
সূচনা পল্যে, নিজস্ব সংবাদদাতা: আমরা যখন ব্যাঙ্ক থেকে লোন নি কিংবা ফিক্সড ডিপোজিটে টাকা রাখি, তখন সেটার সুদের হার ঠিক হয় কার সিদ্ধান্তে? আমাদের আয়, খরচ, এমনকি বাজারের দামও অনেকাংশে নির্ভর করে একটি সংখ্যার ওপর- যার নাম ‘রেপো রেট’। আর সেই রেপো রেট ঠিক করে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক- রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা RBI।
রেপো রেট কী?
রেপো রেট হল সেই সুদের হার, যে হারে ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা RBI, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে টাকা ধার দেয়। যখন কোনও ব্যাঙ্কের কাছে নগদ টাকার ঘাটতি তৈরি হয়, তখন তারা RBI-এর থেকে টাকা ধার নেয়। এই ধার করা অর্থের ওপর যে সুদ দিতে হয়, সেটাই হল রেপো রেট। সহজ ভাষায় বললে, যখন আপনি কোনও ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেন, তখন যেমন সুদ দিতে হয়, তেমনই ব্যাঙ্কগুলি যখন RBI থেকে টাকা নেয়, তখন তাদেরও সুদ দিতে হয়। সেই সুদের নামই রেপো রেট।
মূল্যবৃদ্ধি মাথা নামানোয় ইতিমধ্যেই ১০০ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। তার পর থেকে রেপো রেট- অর্থাৎ যে সুদে RBI ব্যাঙ্কগুলিকে ধার দেয় তা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এখন নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে, ডিসেম্বরের ঋণনীতিতে আর কী সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ৩ থেকে ৫ ডিসেম্বর বসতে চলেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মোনিটারি পলিসি কমিটির বৈঠক। ৫ ডিসেম্বর ঘোষণা হবে সুদের হার সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে দুই বিপরীত মত।
একদল বিশ্লেষকের মতে, এবারও সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি। কারণ খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে প্রায় ০.২৫ শতাংশের কাছাকাছি। এর অর্থ, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির চাপ অনেকটাই কমেছে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে সুদের হার আরও ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে অর্থনীতিতে আরও বেশি টাকা প্রবাহিত করার সুযোগ রয়েছে। এতে শিল্প, ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষ, সবাই সস্তায় ঋণ পাওয়ার সুবিধা পাবে। বিশ্বের বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে দেশের আর্থিক বৃদ্ধিকে আরও গতি দেওয়ার এই সুযোগ আরবিআই হাতছাড়া করবে না বলেই তাঁদের ধারণা।
তবে আরেক পক্ষের যুক্তি একেবারেই আলাদা। তাঁদের মতে, জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধি প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে ৮.২ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তার ওপর সরকার লগ্নি বাড়াচ্ছে, একাধিক ক্ষেত্রে সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে, এমনকি জিএসটির হারেও পরিবর্তনের জল্পনা রয়েছে। ফলে এখনই সুদের হার কমানোর বিশেষ তাড়া নেই। বরং কিছুদিন অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে, যাতে অর্থনীতি অতিরিক্ত গতি পেয়ে অস্থির না হয়ে পড়ে।

কেন RBI এই রেপো রেট বাড়ায় বা কমায়?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেশের অর্থনীতির মধ্যে। যখন দেশে মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশন বেড়ে যায়, তখন বাজারে অতিরিক্ত টাকা ঘোরাফেরা করতে থাকে। মানুষ বেশি খরচ করে, চাহিদা বাড়ে, আর তার ফলেই জিনিসের দাম বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে RBI সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে ব্যাঙ্কের কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং বাজারে টাকার প্রবাহ কমে যায়। এতে দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমে।
আবার অন্যদিকে, যখন দেশের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ধাক্কা খায়, মানুষ কম খরচ করে, তখন RBI রেপো রেট কমিয়ে দেয়। এতে ব্যাঙ্কগুলো কম সুদে টাকা পায়, সাধারণ মানুষও কম সুদে ঋণ নিতে পারে। ফলে ব্যবসা বাড়ে, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়,সঙ্গে দেশের অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হয়।
সম্প্রতি জুন মাসে RBI ২৫ বেসিস পয়েন্ট বা ০.২৫ শতাংশ রেপো রেট কমিয়ে ৫.৫০ শতাংশ করেছিল। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ আছে- বেসিস পয়েন্ট (BPS)। একটি বেসিস পয়েন্ট মানে হল ০.০১ শতাংশ, অর্থাৎ ১০০ বেসিস পয়েন্ট মানে ১ শতাংশ> সুতরাং ২৫ বেসিস পয়েন্ট মানে হল ০.২৫ শতাংশ>
এই রেপো রেট পরিবর্তনের প্রভাব সাধারণ মানুষের উপর কী হয়?
সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়ে লোন বা ঋণের ওপর। যখন রেপো রেট কমে, তখন ব্যাঙ্কগুলিও তাদের লোনের সুদের হার কমায়। ফলে হোম লোন (Home Loan), পার্সোনাল লোন (Personal Loan), কার লোন (Car Loan), শিক্ষা ঋণ (Education Loan) সবকিছুর EMI কিছুটা কমে যায়। এতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়। কিন্তু এর উল্টোটাও সত্যি। যখন রেপো রেট কমে, তখন ব্যাঙ্কগুলি ফিক্সড ডিপোজিট বা FD-র সুদের হারও কমিয়ে দেয়। মানে যাঁরা টাকা জমা রেখে সুদে চালান, তাঁদের আয় কমে যায়।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে- SBI-তে FD সুদ ৬.৮০ থেকে কমে হয়েছে ৬.৬০। HDFC-তে ৭.০০ থেকে কমে হয়েছে ৬.৭৫। ICICI, Axis, Bank of Baroda- সব ক্ষেত্রেই সুদ কমেছে। অর্থাৎ, একদিকে লোন নেওয়া সস্তা হলেও, অন্যদিকে সেভিংসের লাভ কমে যাচ্ছে।
এই রেপো রেটের প্রভাব শেয়ার মার্কেটেও পড়ে। সাধারণত সুদের হার আর শেয়ার বাজার বিপরীতমুখী। যখন সুদের হার বাড়ে তখন ব্যবসাগুলি ঋণ নিতে চায় না, বিনিয়োগ কমে যায়, লাভ কমে। আর শেয়ারের দাম পড়ে।
আর যখন সুদের হার কমে,তখন ব্যবসা বাড়ে,মানুষ বেশি বিনিয়োগ করে ফলে শেয়ার বাজারে ভালো প্রভাব পড়ে। তাই রেপো রেটের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে পুরো দেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে।
রিভার্স রেপো রেট কী?
রেপো রেটে যেখানে RBI ব্যাঙ্ককে টাকা ধার দেয়, রিভার্স রেপো রেটে সেখানে RBI, ব্যাঙ্কের কাছ থেকে টাকা ধার নেয়। মানে, যখন ব্যাঙ্কের কাছে অতিরিক্ত টাকা থাকে, তখন তারা RBI-এর কাছে জমা রেখে কিছু সুদ পায়। এতে বাজারে অতিরিক্ত টাকা কমে আসে। বর্তমানে রিভার্স রেপো রেট রয়েছে ৩.৩৫ শতাংশ।
এই গোটা ব্যবস্থাটা মূলত দেশের টাকা সরবরাহ, মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। আর এই কারণেই RBI বারবার নীতিগত বৈঠক করে রেপো রেট বাড়ানো হবে, কমানো হবে, না অপরিবর্তিত রাখা হবে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
সম্প্রতি RBI আরও জানিয়েছে-চলতি বছরে ভারতের GDP বৃদ্ধির হার থাকবে প্রায় ৬.৫ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবর্ষের জন্য মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস নামানো হয়েছে ৩.১ শতাংশে। অর্থাৎ সরকার ও RBI দু’জনেই চাইছে অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকুক, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকুক, আর সাধারণ মানুষ যেন সুফল পায়। সব মিলিয়ে বলা যায়, রেপো রেট শুধু একটা সংখ্যা নয়- এটা আমাদের ঋণ, সঞ্চয়, বাজার, চাকরি এবং পুরো দেশের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত।