তামিলভূমে এবার কে?পালাবদল নাকি স্ট্যালিনই টানা ১০ বছর!

বধ্যভূম কার? BJP, AIADMK? না বাজিমাত করবেন স্ট্যালিন!

আরপ্লাস নিউড ডিজিটাল ডেস্ক :দক্ষিণী রাজ্য তামিলনাড়ুতেও বেজে উঠেছে ভোটের দামামা। ডিএমকে-কে হারিয়ে বধ্যভূম তামিলনাড়ুতে কি দাগ কাটতে পারবে এডিএমকে এবং বিজেপি জোট। নাকি কুর্সি ধরে রাখতে চলেছেন এম কে স্ট্যালিন।

আগামী ২৩ এপ্রিল ২৩৪ আসনে ভোট তামিলভূমে। গণনা ৪ মে। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন ভোট বৈতরণী পার হতে যেখানে ভরসা রাখছেন তাঁর সরকারের উন্নয়নমূলক কাজকর্মে, সেখানে বিরোধীদের মোক্ষম অস্ত্র অপরাধ, দুর্নীতি এবং রাজ্যের ঘাড়ে চাপতে থাকা ঋণ।

নারীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অপরাধ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থতা এবং ঋণ সংকট ? তামিলনাড়ুতে ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রাধান্য পাচ্ছে। যদিও সে রাজ্যের শাসক দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম বা DMK টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার জন্য জনগণের সমর্থন পেতে তাদের সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং বিনিয়োগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে।
বিদায়ী বিধানসভায় ডিএমকে-র আসন সংখ্যা ১৩৩, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল অল-ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম AIADMK-এর আসন ৬০-র থেকে সামান্য বেশি।

তবে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন শাসক দলের আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও ADMK, BJP এবং অন্যান্যদের নিয়ে গঠিত বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের বিরুদ্ধে আসন্ন নির্বাচন সহজ লড়াই হবে না। এবার দেখে নেওয়া যাক কী, কী বিষয় এক্স ফ্যাক্টর হতে চলেছে তামিলনাড়ু ভোটের নির্বাচনে-
মহিলাদের নিরাপত্তাঃ তামিলনাড়ুতে স্কুলছাত্রীদের নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগজনক ঘটনা রাজ্যে নারী সুরক্ষা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী নেতারা বলছেন অপরাধের ঘটনা বাড়ছে, অন্যদিকে রাজ্য সরকার সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ কমার দাবি করছে।

চলতি বছরের শুরুতেই এডিএমকে রাজ্যপালের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে ২০টি বিভাগে প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছিল। ADMK, BJP এবং অভিনেতা কাম রাজনীতিক বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কাজগাম (টিভিকে)-সহ বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন বিভাগে পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক দুর্নীতি অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে।

শাসক দল ডিএমকে দাবি করেছে, যে তারা ২০২১ সাল থেকে তাদের ৫০৫টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রায় ৩৬৪টি পূরণ করেছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো এই দাবি নস্যাৎ করে অভিযোগ করেছে যে মাত্র ১০-৩০ শতাংশই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেসব প্রধান প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি, তার মধ্যে রয়েছে NEET পরীক্ষা বাতিল করা, পুরানো পেনশন প্রকল্প পুনর্বহাল করা, শিক্ষা ঋণ মকুব করা, দু লাখ সরকারি শূন্যপদ পূরণ করা এবং মাসিক বিদ্যুৎ বিল চালু করা।

ডিএমকে সরকারের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ-ঋণের দায়ে জর্জরিত তামিলনাড়ু সরকার। এডিএমকে শাসক দলের বিরুদ্ধে রাজ্যকে ঋণের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ করেছে এবং উল্লেখ করেছে, ২০২১ সালে ঋণের পরিমাণ ৪.৮৫ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। যা প্রায় দ্বিগুণ। এদিকে, মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের অভিযোগ কেন্দ্রের কাছে বকেয়া টাকা এবং কেন্দ্রীয় কর আটকে রাখায় তামিলনাড়ুর ৩ লক্ষ ১৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অন্য়দিকে ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন বিরোধী দল এডিএমকে-র কাছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। জয়ললিতার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বারের জন্য নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে নামতে চলেছে তাঁরা। ২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ADMK-বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডায় সংখ্যালঘু ভোটাররা ডিএমকে-কে ভোট দিয়েছিল। এবার সেই সংখ্যালঘু ভোট ফিরিয়ে আনাও বড় চ্যালেঞ্জ এডিএমকে-র কাছে। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আলাদাভাবে লড়েছিল এডিএমকে। তবে তাতে লাভের লাভ কিছুই হয়নি। উল্টে স্ট্যালিনের ডিএমকে-তেই আস্থা রেখেছিল ভোটাররা। এডিএমকে প্রধান পালানিস্বামী, যিনি ইপিএস নামেই বেশি পরিচিত, তাঁর জন্যও ২৬ এর নির্বাচন ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জয়ললিতার মৃত্যুর পর পনিরসেলভমের কাছ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি ছিনিয়ে নিলেও তারপরেই নির্বাচনে তাঁর সরকারের ভরাডুবি হয়েছিল। এডিএমকে-র জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে দলটির ঐতিহ্যবাহী ভোটভিত্তি থেভার সম্প্রদায়ের মধ্যে সমর্থনের বিভাজন।

এদিকে শাসক দল ডিএমকে তাদের জোটকে মূলত অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি আরও সম্প্রসারিত করেছে। অভিনেতা কমল হাসানের মাক্কাল নিধি মাইয়াম (এমএনএম) এবং ডিএমডিকে-সহ নতুন সহযোগীদের জোটে সামিল করতে সক্ষম হয়েছেন ডিএমকে প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন।

ডিএমকে-এডিএমকে উভয় দলই কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে বিজেপি -র ত্রিভাষা নীতির মাধ্যমে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় আক্রমণের সুর চড়িয়েছিল। অন্যদিকে গতবছরের এপ্রিল মাসে মন কি বাত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তামিল ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন , কীভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুরা বিশ্বের প্রাচীনতম এই ভাষাটি শিখছে ও এতে গর্বরোধ করছে। তাঁর কথায়, কয়েক হাজার কিলোমিটার দূর ফিজিতে ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নতুন প্রজন্মকে তামিল ভাষার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য বিভিন্ন স্তরে নিরন্ত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এবং তাঁর দল যেভাবে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অলআউট আক্রমণ শানিয়েছিলেন সেক্ষেত্রে এবার ভোটে ভাষা বিতর্ক তাঁর দলের দিকে পালে হাওয়া টানতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
২০২১ সালে তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে ডিএমকে ১৩৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল। গত ২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল ডিএমকে। অন্যদিকে এনডিএ জয়ী হয়েছিল ৭৫টি আসনে যার মধ্যে এডিএমকে পেয়েছিল ৬৬টি আসন।

তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় হতে চলেছে এসআইআর। সেরাজ্যের ৩০টি বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে শহুরে এলাকায় ৩০ শতাংশ-র বেশি ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে এসআইআর চালুর সময় রাজ্যের ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেখানে এবারের সংশোধনে বাদ গিয়েছে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম। এসআই, হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া নাকি ঋণ, অপরাধ মাত্রারিক্ত ঋণ, জাতভিত্তিক ভোট-কোন ফ্যাক্টর কাজ করবে উত্তর দেবে সময়?