আরও এক অভিযোগ সামনে এল পাকিস্তানের রাজনীতিতে। অভিযোগ সামনে এল ইমরান খানকে নিয়ে । কারা সামনে আনল সেই অভিযোগ ?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : কখনও অসুস্থতার খবর। আবার কখনও চাউর হয়েছে জেল থেকে পরিবারের অজান্তে হাসপাতালে ভর্তির খবর । যা নিয়ে দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়েছে রাজনীতি। সেই রোষের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। এসব ছাড়িয়ে আবার কখনও তাঁর মৃত্যুর গুঞ্জনও চাউর হয়। বরাবরই পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক বিতর্কিত কিন্তু অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা তিনি। এবার আরও এক অভিযোগ সামনে এল পাকিস্তানের রাজনীতিতে। অভিযোগ সামনে এল ইমরান খানকে নিয়ে । কারা সামনে আনল সেই অভিযোগ ? কী অভিযোগই বা সামনে এল ? অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন কারা ? কতটা খ্যাতিনামা ব্যক্তি তাঁরা ?
২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ইমরানের বিরুদ্ধে হয় একাধিক মামলা। একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৩ সালে ইমরান খানকে গ্রেফতার করেছিল শাহবাজ সরকার। দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয়, গোপন তথ্য ফাঁস, তহবিল সংক্রান্ত অনিয়ম সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। জেলবন্দি ইমরান খান। জানা যায়, তাঁর ডান চোখে রয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি। দিনের পর দিন জেলে অত্যাচার ও অবহেলার জেরে এক চোখের পুরো দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইমরান খানের দুই চোখের দৃষ্টিশক্তিই একদম স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এরপর থেকে তিনি ক্রমাগত ঝাপসা দেখতে শুরু করেন, যা শেষ পর্যন্ত তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় পুরোপুরি কেড়ে নেয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে, চোখের সমস্যার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং একটি ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও করা হয়েছিল। কিন্তু এই পুরো বিষয়টিই হয়েছিল পরিবারের অজান্তেই।
এবার পরিবারের তরফেই ওঠে আরও এক বিস্ফোরক অভিযোগ। দাবি করা হয় জেলের মধ্যে ইমরান খানকে খুনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আর সেই চেষ্টা করছেন মহসিন নকভি ও আসিম মুনির। এরকমই বিস্ফোরক অভিযোগ পাকিস্তানের বিশ্বজয়ী অধিনায়কের বোনেদের। সম্প্রতি ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এমনই দাবি করেন তাঁর বোন ডঃ উজমা খান ও আলিমা খান। অভিযোগের আঙুল তোলেন দুজনের দিকে। একজন হলেন, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভি এবং অন্যজন হলেন আসিম মুনির। সেদেশের সেনা সর্বাধিনায়ক। ইমরানের দুই বোন উজ়মা খান ও আলিমা খানকে জেলে গিয়ে দাদার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। একটি সাংবাদিক বৈঠকে খুনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। উজ়মা বলেন, দাদা কয়েক দিন আগেই তাঁদের বলেছেন, তাঁকে মেরে ফেলা হবে। তাঁকে খুনের ছক কষাও হয়ে গিয়েছে। উজ়মার অভিযোগ, পাকিস্তানে বিরোধীদের সঙ্গে কী হবে, তার সব সিদ্ধান্ত মুনির নিচ্ছেন। তাঁকে মদত দিচ্ছেন নকভি।
এই অভিযোগ যখন সামনে এসেছে। তখন ভাইরাল হয়েছে মহসিন নকভি ও ইমরান খানের পুরানো এক ভিডিও। যেখানে দেখা যায় ইমরান নিজেও মহসিন নকভির বিরুদ্ধে সরব হন। নকভির বিরুদ্ধে আনা হয় ৩৫ লক্ষ টাকা চুরির অভিযোগ ।
এই পরিস্থিতিতে ৫ দেশের ১৪ জন প্রাক্তন ক্রিকেটার অধিনায়ক ইমরানের জন্য আবেদন জানিয়েছে পাক সরকারের কাছে। বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তান ক্রিকেটের সম্পর্ক বেশ খারাপ, এমনকি দুই দল যখন মুখোমুখি হয় তখন দুই দলের মধ্যে করমর্দন করতেও দেখা যায়না। সেখানে দাঁড়িয়ে ভারতের দুই কিংবদন্তি – কপিল দেব ও সুনীল গাভাস্কার ইমরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ইমরানের জন্য সই করেছেন মাইকেল আথারটন, অ্যালান বর্ডার, মাইকেল ব্রিয়ারলি, গ্রেগ চ্যাপেল, ইয়ান চ্যাপেল, বেলিন্ডা ক্লার্ক, ডেভিড গাওয়ার, কিম হিউজ, নাসের হুসেন, ক্লাইভ লয়েড, স্টিভ ওয়া এবং জন রাইট। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, উইন্ডিজদের অধিনায়করা সই করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ক্রিকেটদুনিয়ায় ইমরান একজন কিংবদন্তি। সইমরান খানের সুস্থতা কামনা করেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও।
একসময়ের সেনাবাহিনীর পছন্দের নেতা বলে পরিচিত ছিলেন ইমরান। কিন্তু ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। তারপর থেকেই সামরিক নেতৃত্বের দূরত্ব চরমে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর বোনেদের করা অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও রহস্যমৃত্যুর নজির রয়েছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠনের পর থেকে একের পর এক পাক রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যর কারণ হয়েছে কখনও ফাঁসি, কখনও গুলি কখনও বা আত্মঘাতী বোমা হামলা। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানি বাগে হত্যা করা হয়েছিল পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানকে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আলি জিন্নার একজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি। মুসলিম লিগের এক জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময়, মঞ্চেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গফ্ফর খানের ভাই খান আব্দুল জব্বর খান ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৫৮ সালের ৯ মে আট্টা মহম্মদ নামে এক ব্যক্তি তাঁকে হত্যা করেছিলেন। সেই সময় জব্বর খান লাহোরে তার ছেলের বাড়ির বাগানে বসে ছিলেন। আসন্ন সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। জুলফিকার আলি ভুট্টো ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৯ সালে, জেনারেল জিয়া-উল হকের সামরিক শাসন চলাকালীন ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। তৎকালীন পাকিস্তানের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তিনি। আইন বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে জুডিশিয়াল মার্ডার অর্থাৎ বিচারবিভাগীয় হত্যা বলেই মনে করেন। ১৯৭৭ সালে জুলফিকারের বিরুদ্ধে একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন সেনাপ্রধান জিয়া।
সেদিক থেকে দেখতে গেলে ইমরান খানকে নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত নতুন নয়। কিন্তু সরাসরি সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে খুনের ছকের অভিযোগ পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিল।