
অনুসুয়া দাস, নিজস্ব সংবাদদাতা: ডিসেম্বরের শুরুতেই ভারত সফর সারেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে ২৩তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী ও ভ্লাদিমির পুতিন। দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকে উঠে আসে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গও। পুতিন ঘোষণা করেন যে তার দেশ ভারতকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ করতে প্রস্তুত। ভারতকে তাদের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়তে মস্কো দিল্লিকে সহায়তা দিচ্ছে। জানান পুতিন। রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে উঠে আসছে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ট্রাম্পের সঙ্গেও বন্দুত্বপ্রীতি প্রকাশ পেয়েছে বারে বারে। সবই ঠিক আছে। তবে এরই মাঝে চিন করে বসে এক দাবি। যদিও তা মামুলি বা ছোট কিছু দাবি নয়। বেশ বড়ই বলা যেতে পার। তাকে আবার সায় বা সমর্থন যাই বলা যায়, তা করেছে এক রাষ্ট্র। যদিও বিগত দিনে সেই দেশ কখনই যে ভারতের সঙ্গে খুব একটা সু সম্পর্ক বজায় রেখেছে বা রাখতে চেয়েছে, তার কোনও প্রমাণ মেলেনি। কথাতেই আছে যে শত্রুর শত্রু মিত্র। এ জন্যই চিনকে তার সমর্থন কিনা, তা যদিও স্পষ্ট নয়।
এবার আসা যাক আসল কথায়। মানে কী এমন দাবি করে বসল চিন। যার জন্য তৈরি এত বিতর্ক। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশ। স্থলবেষ্টিত রাজ্য এটি। এর দক্ষিণে ভারতের অঙ্গরাজ্য আসাম, পশ্চিমে ভুটান, উত্তর ও উত্তর-পূর্বে চিন, এবং পূর্বে মিয়ানমার। অরুণাচল প্রদেশের আয়তন ৮৩,৭৪৩ বর্গকিলোমিটার। রাজধানী ইটানগর। চিনের তিব্বতের সঙ্গে ১১২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। দক্ষিণে পাহাড়ের পাদদেশীয় এলাকা দিয়ে শুরু হয়ে ক্ষুদ্রতর হিমালয় পর্বতমালায় । অপরূপ সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ অরুণাচল। উত্তরে তিব্বতের সঙ্গে সীমান্তের কাছে বৃহত্তর হিমালয় পর্বতমালায় মিশেছে। ব্রহ্মপুত্র নদ ও তার বিভিন্ন উপনদী তিরাপ, লোহিত, সুবর্ণসিড়ি ও ভারেলি এখানকার প্রধান নদনদী।

এই অরুণাচল প্রদেশ নাকি ভারতেরই অংশ নয়। এটা নাকি চিনের অংশ। এমনই দাবি পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না বা চিনের। হাস্যকর এই দাবি মামার বাড়ি আবদার বললেও ভুল বলা হবে না। ২০২৫ সালের জুন মাসে পাকিস্তান ঘোষণা করেছিল চিনের সার্বভৌমত্ব ও টেরিটরিকে সমর্থন করে তারা। এর থেকে দুটো দিক স্পষ্ট। একদিকে পাকিস্তান সরাসরি ভারতের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে এটাও বলছে, অরুণাচল নাকি ভারতের অংশই নয়, চিনের অংশ।
মোটামুটি সবই তো ঠিক ছিল। কী থেকে এই সংশয়ের সূত্রপাত, বা বলা যায় বিতর্কের সূত্রপাত। নভেম্বরেই এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় ভারতীয় এক মহিলাকে। শুধু অস্বস্তিকর বললে যদিও ভুল বলা হবে। রীতিমতো অপমানজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় মহিলাকে। প্রায় ১৮ ঘণ্টা চিনের সাংহাই পুডং বিমানবন্দরে আটকে রাখা হয়। বিমানবন্দরের আধিকারিকরা তাঁর ভারতীয় পাসপোর্ট মানতে চাননি। পাসপোর্ট জন্মস্থান ‘অরুণাচল’ দেখেই ভিসা বাতিল করা হয়, পাসপোর্ট ‘অবৈধ’ বলে দাবি করা হয় ব্রিটেনে কর্মরত পেমা ওয়াংজম থন্ডককে। পেমার বাবা এল. ডি. থংডক ছিলেন রাজ্যের এক জন নামকরা প্রযুক্তিবিদ। কোভিডের সময়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ২১ নভেম্বর লন্ডন থেকে জাপানে ছুটি কাটাতে যাওয়ার সময়ে সাংহাইতে তাঁর লে-ওভার ছিল। সেখানেই ওই ঘটনা ঘটে। পেমা সংবাদমাধ্যমকে জানান, ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে কোনও কারণ না জানিয়ে তাঁকে টেনে বার করে নেওয়া হয়। ভারতীয় মহিলা চিনে গিয়ে এক বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার । তাহলে মূল কথা কী দাঁড়াল। এই পুরো ঘটনায় নাম উঠে আসে দুই রাষ্ট্রের। অরুণাচল নিয়ে দুই দেশের তরফ থেকেই স্টেটমেন্ট দেওয়া হয়। নরম- গরম একের পর এক স্টেটমেন্টে তৈরি হয় কড়া বিতর্ক। চিন ও ভারত। এখানে অন্য কোনও দেশের দেনা-পাওনাই নেই। তবে ওই যে বাংলায় এক চলতি কথা রয়েছে, বাঁশের থেকে কনচির দরদ বেশি, সেটাই দেখা গেল পাকিস্তানের স্টেটমেন্ট দেখে। বিতর্কের মাঝে ফাউয়ের মতো নাক গলাল পাকিস্তান। চিনের ঝোল টেনে পাকিস্তানকে বলতে শোনা যায়, ভারত যাকে অরুণাচল মানে, ওটা নাকি অরুণাচলই নয়, ওটা চিনের জ্যাঙ্কনান। মামার বাড়ি আবদার নয়তো কী বলা যায় একে?
ভারতের ম্যাপ দেখলে, একেবারে উত্তর-পূর্বে অরুণাচলের অবস্থান স্পষ্ট দেখা যায়। এতে কোনও সংশয়ই নেই। তবে বিশ্বে তিন এমন দেশ রয়েছে, যারা মনে করে অরুণাচল ভারতের নয়, চিনের অবিচ্ছেদ্র অংশ
যে তিনটি দেশ মনে করে অরুণাচল চিনের অংশ, তারা হল পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না (চিন), তাইওয়ান, পাকিস্তান। সব কিছু স্বাভাবিক চলবে। হঠাৎ হঠাৎ কোনও দেশ ভারতের কোনও অংশকে নিজের অংশ বলে দাবি করলেই তো আর হল না। তার জন্য স্টেটমেন্ট, স্ট্রাইক। এতো লেগেই রয়েছে। তবে ভারতের মতো শক্তিশালী দেশ চুপচাপ তো আর বসে থাকবে না। নিজেই স্ট্যটেজি বদলে ফেলেছে। পাকিস্তান আমাদের যে অংশ অর্থাৎ পাক অকুপায়েড কাশ্মীর বা পিওকে নিজের কব্জায় রেখেছে। নিজের অংশ ফিরে পেতে মরিয়া ভারতও। ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এক নিজস্ব ম্যাপ তৈরি করে ফেলেন। যেখানে গুজরাতের জুনাগড়কে পাকিস্তানের অংশ বলে দাবি করা হয়।
ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে বরাবরই বিস্তর ফারাক। ভারত সর্বদা শান্তি-রক্ষার কথা বলে থাকে। পাকিস্তানের কাজে কর্মে যদিও কখনই তেমন কিছু ধরা পড়ে না। তা তো অরুণাচলের প্রসঙ্গেও ধরা পড়ল। চিন ও ভারতের লেনাদেনা রয়েছে অরুণাচলকে নিয়ে. সেখানে আলটপকা স্টেটমেন্ট পাকিস্তানের। পাকিস্তান নাকি অরুণাচলকে চিনের জ্যাঙ্কনান হিসাবেই দেখে। আরে বাবা পাকিস্তানের ভাবনা-চিন্তায় কিছুই যায় আসে না, সেটা তো ভাবতে হবে পাকিস্তানকে।
এই যেমন আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব রয়েছে দুরান্ড লাইন নিয়ে। এখানেও তো ভারত চাইলে আগুনে ঘি ঢালতেই পারত। মানে ধরুন আফগানিস্তানের সমর্থনে ভারত স্টেটমেন্ট দিতেই পারত। না। যদিও তা করেনি ভারত। ভারত জিও পটিলিক্যাল দেশ। বরাবরই যার সমর্থন করেছে, বা করছে, তার পিছনে বরবারই রয়েছে এক স্বচ্ছ কারণ। তবে পাকিস্তান আবার এসব জিও পলিটিক্যাল মানে না। তাই তো চিন ও ভারতের ঝামেলার মধ্যে তাকে ঢুকতেই হল। অবাঞ্চিত-র মতো। তবে মন গড়া কথাতে তো আর চিড়ে ভেজে না। তাই কে অরুণাচলকে ভারতের বাইরে ভাবল, বা কে অরুণাচলকে চিনের জিঙ্কনান ভাবল, তাতে কিছুই যায় আসে না। অরুণাচল ভারতের ছিল, আছে, থাকবে।