ইরানকে নিয়ে কেন দুশ্চিন্তা ওয়াশিংটনের ?

পারমাণবিক অস্ত্র না থাকা ইরানকে নিয়ে ওয়াশিংটনের দুশ্চিন্তা। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তাকে নিয়ে কেন নিশ্চিন্ত ওয়াশিংটন ?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : কাগজে-কলমে দেখলে ছবিটা একেবারে উল্টো। উত্তর কোরিয়ার হাতে ইতিমধ্যেই কয়েক ডজন পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এমনকি আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রও (আইসিবিএম) তারা সফলভাবে পরীক্ষা করেছে, যা দেখে খালিচোখেও বলা যায় যা উত্তর কোরিয়া সহজেই আমেরিকার মূল ভূখণ্ডেও আঘাত হানতে পারে। অন্য দিকে ইরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক নয়।

তা সত্বেও দেখা যাচ্ছে, ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক তৎপরতা, সামরিক প্রস্তুতি এবং নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগের তালিকায় তেহরান প্রায়শই অনেক বেশি গুরুত্ব পায় পিয়ংইয়ংয়ের তুলনায়। এখানেই বড় প্রশ্ন হল —যে দেশের হাতে পরমাণু বোমা নেই, তাকে নিয়েই বা এত আতঙ্ক কেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈপরীত্যের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে দুই দেশের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য, অবস্থান এবং কৌশলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের মধ্যেই।

প্রথমত, দুই দেশের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আলাদা। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য শাসক পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষা করা। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে থাকা পিয়ংইয়ং মূলত আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বার্তা দিতে চায়—তাদের আক্রমণ করলে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হবে। অর্থাৎ, এটি এক ধরনের প্রতিরোধমূলক অস্ত্রনীতি।

অন্যদিকে ইরানকে আঞ্চলিক শক্তি বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগোনো এক রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে তেহরানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লা, গাজায় হামাস, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী কিংবা ইরাক-সিরিয়ায় শিয়া মিলিশিয়াদের মতো সংগঠনের মাধ্যমে ইরান বহুদিন ধরেই প্রভাব বিস্তার করছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, যদি ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র চলে আসে, তবে সেই অস্ত্রকে ‘সুরক্ষার ছাতা’ হিসেবে ব্যবহার করে তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর কোরিয়া কার্যত তিনটি শক্তিধর রাষ্ট্র—চিন, রাশিয়া এবং আমেরিকা-সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ঘেরা। ফলে কোনও সংঘাত হলেও তা অনেকাংশে ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি চিনও পিয়ংইয়ংয়ের উপর একটি নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভাব বজায় রাখে, কারণ সীমান্তে অস্থিরতা তারা চায় না।

কিন্তু ইরানের অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। হরমুজ প্রণালীর পাশে থাকা এই দেশটির আশপাশ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব প্রণালীও তাদের প্রভাব বলয়ের কাছাকাছি। ফলে এই অঞ্চলে বড় সংঘাত শুরু হলে তা সরাসরি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ধাক্কা দিতে পারে।

তৃতীয়ত, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কাও রয়েছে। ইরান যদি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তবে সৌদি আরব, তুরস্ক বা মিশরের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলিও নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে একই পথে হাঁটতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে বহু-মেরু পারমাণবিক প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি হবে—যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সবশেষে রয়েছে সময়। উত্তর কোরিয়া প্রায় দুই দশক আগেই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের তৈরি করেছে। এখন আমেরিকার কৌশল মূলত নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইরান এখনও ‘থ্রেশহোল্ড স্টেট’—অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্র। ফলে এখনও সেই সীমা অতিক্রম করা থেকে তাদের আটকানোর চেষ্টা চলছে জোরকদমে।

সবমিলিয়ে, উত্তর কোরিয়া যেখানে মূলত নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করছে, সেখানে ইরানকে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে সক্ষম সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে। আর সেই কারণেই তেহরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ অনেক বেশি তীব্র।