বিশ্বশক্তির টানাপড়েনে বাংলাদেশ, স্বার্থই কি শেষ কথা ?

তারেক রহমানের সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত, চিন, আমেরিকা কাকে ছেড়ে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াবে নতুন বাংলাদেশ ?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের ধুলো এখনও পুরোপুরি বসেনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পালাবদলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ঢাকার সামনে তৈরি হয়েছে এক জটিল পরিস্থিতি।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রায় দেড় বছর ধরে মহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে বাংলাদেশের বিদেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। সেই সময় থেকেই বঙ্গোপসাগর ঘিরে বিভিন্ন বিশ্বশক্তির আগ্রহ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। ফলে নতুন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কার সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠতা রাখবে বাংলাদেশ ?

আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠোর বাস্তব বলছে, কোনও দেশ অন্য দেশের ‘চিরস্থায়ী বন্ধু’ নয়। প্রতিটি রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই সামনে আসছে।

বর্তমানে মূলত তিনটি শক্তি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে আগ্রহী। তারা হল—চিন, আমেরিকা এবং ভারত। প্রত্যেকেরই নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে।

চিনের লক্ষ্য মূলত বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক উপস্থিতি শক্তিশালী করা এবং এই অঞ্চলে আমেরিকা ও ভারতের প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করা। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশে ২৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পরিকাঠামো বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেজিং। পাশাপাশি আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন কারখানা বা যুদ্ধবিমান সরবরাহের প্রস্তাবও রয়েছে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে আমেরিকার কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজারগুলির মধ্যে একটি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতার কথাও বলে ওয়াশিংটন। তবে একইসঙ্গে তারা চায়, বাংলাদেশ যেন চিনের প্রভাব সীমিত রাখে—যা ঢাকার কূটনৈতিক ভারসাম্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তৃতীয় শক্তি ভারত, যার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক বেশি ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক। দুই দেশের মধ্যে বহু নদী, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে সমর্থন এবং বর্তমানে তাঁর ভারতে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের একাংশের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে। ফলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আবেগ বড় ভূমিকা নিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদেশনীতি দীর্ঘসময়ে একদিকে ঝুঁকেছে। শেখ হাসিনার আমলে ভারতের দিকে ঝোঁক বেশি ছিল বাংলাদেশের। আবার তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চিনের সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে তারা।

এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের সামনে বড় কাজ হল ভারসাম্যপূর্ণ নীতি তৈরি করা। অর্থাৎ, আমেরিকার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা, চিনের পরিকাঠামো বিনিয়োগ গ্রহণ করা এবং সমান্তরালভাবে ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া—সবটাই করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে।

একইসঙ্গে অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করা জরুরি। ২০২৬ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে। ফলে বিপুল শুল্ক সুবিধা আর থাকবে না। শুধুমাত্র পোশাক শিল্পের উপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বিনিয়োগ ও দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলাও প্রয়োজন।

সবমিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বরাজনীতির টানাপড়েনে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ঝুঁকিও। সবমিলিয়ে কোনও বিদেশি শক্তি নয়—দেশের অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের ঐক্যই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।