পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ১ মাস পেরিয়েছে। এর মধ্যেও বিশ্ব তেলপথে দখল তেহরানের।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এক মাস পেরোতেই স্পষ্ট হচ্ছে এক নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের একাধিক শীর্ষ সামরিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, কৌশলগত দিক থেকে পাল্লা ভারী তেহরানেরই। তাদের মূল চাবিকাঠি—হরমুজ প্রণালীর উপর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ, যা পারস্য উপসাগরকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে, কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। মার্চ মাসে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ছ’টি জাহাজ এই পথ পেরিয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এই সংখ্যা প্রায় ১৩৫। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ইরান বা তার মিত্র দেশগুলির ট্যাঙ্কার।
জাহাজ চলাচলে ইলেকট্রনিক বিঘ্ন, ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা এবং নিরাপদ পথের জন্য ইরানের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে হরমুজ এখন কার্যত ‘নিয়ন্ত্রিত করিডর’। বহু জাহাজ ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলাচল করছে, ওমানের দিক এড়িয়ে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ ইতিমধ্যেই আটকে পড়া ট্যাঙ্কার ছাড়াতে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতায় গিয়েছে।
এরই মধ্যে নতুন আইন পাশ করে হরমুজ দিয়ে যাতায়াতে শুল্ক আরোপ এবং মার্কিন ও ইজরায়েলি জাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে ইরান। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী এই প্রণালীতে অবাধ যাতায়াতের কথা থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিয়ম কার্যত অচল।

যুদ্ধের মাঝেও ইরানের তেল রফতানি থেমে নেই—বরং বেড়েছে। দৈনিক প্রায় ১৮ লক্ষ ব্যারেল তেল রফতানি করছে তেহরান, যার অধিকাংশই যাচ্ছে চিনে। অন্যদিকে ইরাক ও সৌদি আরবের রফতানি বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক মাসে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। ভারত, তুরস্ক, পাকিস্তানের মতো জ্বালানি-নির্ভর দেশগুলি ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি ওয়াশিংটনও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতি হলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। বীমা খরচ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী এখন বিশ্ব অর্থনীতির এক অস্থির ‘চোকপয়েন্ট’, যার রাশ অনেকটাই ইরানের হাতে।