পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সংঘাতে নতুন উদ্বেগ বিশ্বমঞ্চে !

ডুরান্ড লাইন ঘিরে ছোটখাটো সংঘর্ষ, গোলাগুলি এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছিলই। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সেই উত্তেজনা বিপজ্জনক মাত্রায় চলে গিয়েছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তে উত্তেজনা চলছিল। কিন্তু মার্চের শুরুতেই পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সংঘাত এখন আর শুধু সীমান্ত সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই—দুই দেশের মধ্যে কার্যত ‘খোলা যুদ্ধ’-এর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা।

গত কয়েক বছরে সীমান্তবর্তী ডুরান্ড লাইন ঘিরে ছোটখাটো সংঘর্ষ, গোলাগুলি এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছিলই। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই পুরনো উত্তেজনাকে বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে।

এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তান তালিবান বা তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তানের তালিবান সরকার টিটিপি জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। এই সংগঠনটি গত কয়েক মাসে পাকিস্তানের ভিতরে একাধিক ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইসলামাবাদে একটি শিয়া মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এই উত্তেজনার প্রেক্ষিতেই ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে বড় পদক্ষেপ করে পাকিস্তান। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের নানগারহার, পাকতিকা এবং খোস্ত প্রদেশে একাধিক বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তানের দাবি, ওই হামলায় বহু জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে আফগান প্রশাসন এবং রাষ্ট্রসংঘের মতে, ওই হামলায় সাধারণ নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন—যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে।

তারপরেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালিবান সীমান্তে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানের একাধিক সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা এবং স্থল আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে।

পরের দিনই ইসলামাবাদ আরও কঠোর অবস্থান নেয়। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ প্রকাশ্যে খোলা যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পাকিস্তান শুরু করে ‘অপারেশন গজব লিল হক’। এই অভিযানের অংশ হিসেবে আফগানিস্তানের গভীরে বিমান হামলা চালানো হয় বলে খবর। এমনকি রাজধানী কাবুল এবং কান্দাহারের কাছাকাছি এলাকাকেও টার্গেট করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রসংঘের হিসাব বলছে, কয়েকদিনের মধ্যেই প্রায় ১৬ হাজারের বেশি পরিবার ঘরছাড়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষত এখনও শুকোয়নি আফগানিস্তানে। তার মধ্যেই নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মানবিক সঙ্কট আরও গভীর হয়েছে।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টোরখাম সীমান্তের কাছে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র আংশিক ধ্বংস হয়েছে বা বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এই সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছে, আফগানিস্তান নাকি ভারতের ‘প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করছে। যদিও নয়াদিল্লি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।

অন্য দিকে, চিনও পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে। পাকিস্তানে চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)-সহ বহু বড় বিনিয়োগ রয়েছে বেজিংয়ের। এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে সেই প্রকল্পগুলিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতে কোনও পক্ষেরই প্রকৃত জয়ের সম্ভাবনা নেই। আফগানিস্তানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর মতো আধুনিক সামরিক পরিকাঠামো নেই। আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং বালোচিস্তানের বিদ্রোহের মধ্যে পাকিস্তানের পক্ষেও দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার দাবি জোরালো হচ্ছে। তুরস্ক, রাশিয়া এবং চিন ইতিমধ্যেই সংঘাত কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হলে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার এই সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে।