তারেকের জামানায় ফিরবেন শাকিব?

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অনেক আগে তিনি দেশের বাইরে ছিলেন, কিন্তু আওয়ামি আমলের সাংসদ হওয়ায় এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার কারণে তার দেশে ফেরা দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চিত ছিল।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস যেন এক নাটকীয় রূপান্তরের সাক্ষী। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুন্থান ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট চূড়ান্ত রূপ নেয়। প্রবল জনআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। বোন রেহনাকে সঙ্গে নিয়ে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। এই আকস্মিক পরিবর্তনের ধাক্কায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন কার্যত এলোমোলো হয়ে পড়ে। আওয়ামি লিগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে আওয়ামী লিগের কর্মীরাও আত্মগোপনের চলে যান। অনেকেই খুন-সহ একাধিক মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে কারাগরে দিন কাটাতে থাকেন। গোটা দেশজুড়ে তৈরি হয় এক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও নতুন পথের খোঁজে অপেক্ষার আবহ। হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের ভার গ্রহণ করেন মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা। কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গেলেও এই আন্তর্বর্তী সরকার ধীরে ধীরে দেশকে একটি নির্বাচনের পথে নিয়ে যায়। অবশেষে এই বছর অনুষ্ঠিত এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। জনগণের বিপুল সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ বিরতির পর তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্রীড়াঙ্গন দুটি ক্ষেত্রেই যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সরকারের পালাবদলের পর দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গে ক্রীড়াক্ষেত্রেও শুরু হয়েছে পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া। এই পরিবর্তনের ধারায় একের পর এক সিদ্ধান্ত ও ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিস্তর আলোচনা। জাতীয় দল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যেমন ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে বিস্ময় ও হতাশা তৈরি করেছে, তেমনি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের ধারাবাহিক ব্যর্থতা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দলের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব নিয়ে। এর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও ক্রীড়া সম্পর্কের টানাপোড়েনও মাঠের বাইরের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, দেশের ক্রীড়াঙ্গন যেন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই হয়ে উঠছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে শাকিব আল হাসানকে ঘিরে শুরু হওয়া প্রত্যাবর্তনের আলোচনা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অনেক আগেই তিনি দেশের বাইরে ছিলেন, কিন্তু আওয়ামি আমলের সাংসদ হওয়ায় এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার কারণে তার দেশে ফেরা দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চিত ছিল। তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির বদল, বিএনপি নেতৃত্বের ইতিবাচক মনোভাব এবং বিসিবির সক্রিয় উদ্যোগে শাকিবের ফেরার সম্ভাবনা আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুঞ্জন, বোর্ড পরিচালকদের নিয়মিত তৎপরতা এবং সরকারের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি। সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, শাকিবকে ঘিরে নতুন এক অধ্যায়ের প্রস্তুতি চলছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের আশা, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের আমলেই আবার দেশে ফিরবেন শাকিব, এবং লাল-সবুজের জার্সিতে মাঠ মাতাবেন তার ব্যাট ও অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বহু আগেই দেশ ছড়ে বিদেশে অবস্থান করছিলেন বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার ও আওয়ামি লিগের আমলের সাংসদ শাকিব আল হাসান। দেশের বাইরে থাকাকালীন সময়েই তার বিরুদ্ধে খুন-সহ একাধিক গুরুতর মামলা দায়ের হওয়ায় দেশে ফেরা নিয়ে তৈরি হল জটিলতা ও অনিশ্চয়তা। এসব আইনি ঝামেল ও পরিবর্তত রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে শাকিবের প্রত্যাবর্তন দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নের মুখে ছিল, যা তাঁকে ঘিরে আলোচনা ও কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়।

মুস্তাফিজের বাদ পড়া, টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের লড়াই, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং শাকিব আল হাসানের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন। এই সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে। সঠিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং ইতিবাচক মানসিকতার সমন্বয়ে যদি এই সংকটের মোকাবিলা করা যায়, তবে তারেকের জমানায় শাকিবের প্রত্যাবর্তন হতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এক নতুন সূচনা। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, হতাশা ও অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে এগোনো এই যাত্রায় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনেও জমেছে নানা প্রশ্ন, আশা আর অপেক্ষা। ঠিক এমন সময়েই শাকিবের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের খবর যেন নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে। তার অভিজ্ঞতা, লড়াকু মানসিকতা এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য আবারও বাংলাদেশ দলকে ফিরিয়ে দিতে পারে হারানো আত্মবিশ্বাস। দেশের ক্রিকেটে নতুন করে জেগে উঠতে পারে জয়ের স্বপ্ন, গ্যালারিতে ফিরতে পারে সেই পুরোনো উন্মাদনা। তাই আজ সবার কণ্ঠে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা, আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন পেরিয়ে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝেই কি তবে তারেকের জমানায় ফিরবে শাকিব? যদি সত্যিই তা ঘটে, তবে তা কেবল একজন তারকা ক্রিকেটারের প্রত্যাবর্তন হবে না, বরং এটি হয়ে উঠবে পরিবর্তনের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর এক শক্তিশালী প্রতীক, যেখানে অনিশ্চয়তার অন্ধকার ছাপিয়ে নতুন আশার আলোয় আবারও পথ দেখাবে বাংলাদেশের ক্রিকেট।