বাংলাদেশে ফিরবেন তারেক?

বাংলাদেশে ফেরার ব্যাপারে এখনও কি মানসিক ভাবে প্রস্তুত নন তারেক রহমান। মা-এর অসুস্থার খবরে যখন বিএনপি উদ্বিগ্ন তারেক

জুলেখা নাসরিন, নিজস্ব সংবাদদাতা:  বিএনপি-র অন্দরে গুঞ্জন, অসুস্থ মা-এর পাশে থাকতে দেশে ফিরছেন তারেক রহমান। এবং দেশে ফেরার জন্য তার সমস্ত প্রস্তুতিও ইতিমধ্যে সারা হয়ে গিয়েছে। আর সেই গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে তারেক রহমান ও তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের পোষ্য বিড়ালের জন্য। তারেক ও জাইমা রহমানের খুব কাছের পোষ্য জীবু নামের এই বিড়াল। জানা যাচ্ছে, তারেক রহমানের অত্যন্ত স্নেনের জীবুর পাসপোর্ট ইতিমধ্যে কনফার্ম হয়েছে। বাংলাদেশের একাধিক সংবাদপত্রেও জীবুর পাসপোর্ট যে কনফার্ম হয়েছে সেই বিষয়টি বলা হয়েছে। ফলে এটা বলা যায়, জীবুর পাসপোর্ট পাওয়া তারেক রহমানের দেশে ফেরার জল্পনা আরও কিছুটা বাড়ল। জীবুর সঙ্গে তোলা তারেক রহমানের ছবি গত কয়েক মাসে বেশ ভাইরাল সমাজ মাধ্যমে। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে বিএনপি-র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জীবুর বিষয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন। জীবুর সঙ্গে তাঁর এবং তার পরিবারের কেমন সম্পর্ক সেটাও জানান তারেক রহমান। বিভিন্ন সময় তারেক রহমানের বিড়ালের সাথে খুনসুটির ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জীবু আসলে তারেক কন্যা জাইমা রহমানের পোষ্য। সেটা সাক্ষাৎকারের সময় স্পষ্ট করেছিলেন তারেক রহমান। তিনি বলেছিলেন , হতে পারে জীবু জাইমা রহমানের পোষ্য, তবে তাঁদের বাড়ির প্রত্যেকের প্রিয় জীবু। প্রত্যেকে জীবুকে আদর করে। ফলে তারেক রহমান দেশে ফিরলে শুধু পরিবার নিয়ে ফিরবেন না, তিনি জীবুকেও সঙ্গে নিয়ে আসবেন এটা স্পষ্ট হল। 

পোষ্য জীবুর যেহেতু পাসপোর্ট হয়েছে, এবং জীবু যেহেতু রহমান পরিবারের খুব ঘনিষ্ঠ তাই বিএনপি সমর্থকরা একশো শতাংশ ধরে নিয়েছেন, যে তারেক রহমান ফিরছেন। মেনে নিলাম জীবুর পাসপোর্ট বা অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু যাকে এই মুহূর্তে বিএনপি-র সবথেকে বেশি দরকার, খালেদা জিয়ার যাকে এই মুহূর্তে সবথেকে প্রয়োজন সেই তারেক রহমানের পাসপোর্টের কী অবস্থা..। দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্ট বা অনুমোদন মিলেছে কি তারেক রহমানের ? প্রত্যেকে কমবেশি জানেন, লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন তারেক রহমান। ২০১২ সালে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অনুমোদন চেয়ে পাসপোর্ট জমা দেন তারেক রহমান। তারেক রহমান যে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন এবং সেই আশ্রয়ের জন্য তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন সেটা প্রকাশ্যে আসে ২০১৮ সালে। ২০১৮সালে বিএনপি-র মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলঙ্গীর জানান, তারেক রহমান লন্ডনের রাজনৈতিক আশ্রয়ের অনুমোদনের জন্য তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন ২০১২ সালে। তার মানে এই মুহূর্তে তারেক রহমানের কাছে কোনও পাসপোর্ট নেই। তা সত্ত্বেও তারেক রহমান এখনও পর্যন্ত কোনও ট্রাভেল পাস চাননি। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য, তারেক রহমান ট্রাভেল পাসের আবেদন করলে এক ঘন্টার মধ্যে তাকে সেই পাস দিতে প্রস্তুত অন্তবর্তী সরকার। সাধারণ ভাবে ট্রাভেল পাস পেতে একদিন সময় লাগে, তবে তারেক রহমানের জন্য সেটাও লাগবে না। কারন অন্তবর্তী সরকারও চাইছে তারেক রহমান দ্রুত দেশে ফিরুন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারেক রহমানের মতো হেবিওয়েট ব্যক্তির কেন ট্রাভেল পাস লাগবে। সেই প্রশ্নর উত্তর এড়িয়ে গিয়েছে বিএনপি। আপনাদের জানিয়ে রাখি, ২০১৫ সালে একবার ট্রাভেল ডকুমেন্টস নিয়ে লন্ডন থেকে মানয়েশিয়া গিয়েছিলেন তারেক রহমান। কারন ২০১৫ সালে মালয়েশিয়াতে প্রয়াত হন তারেক রহমানের ভাই তথা খালেদা জিয়ার ছোট ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। আরফাত রহমান কোকোর শেষকৃত্যে যোগ দিতে এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন তারেক রহমান।

তবে তারেক রহমানের ট্রাভাল পাস পাওয়া নিয়েও একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। অনেকে এখানে প্রশ্ন তুলতে পারেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। হয়তো পরিস্থিতির কারনে তার কাছে পাসপোর্ট না থাকতে পারে, কিন্তু তার দেশে ফিরতে ট্রাভেল পাস কেন লাগবে। কেন পাসপোর্টের পরিবর্তে তাকে ট্রাভেল পাস দিতে চাইছে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রক। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ১৫ মাস পরে এসে তারেক রহমানের দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্টের বদলে ট্রাভেল পাসের প্রসঙ্গ আসছে কেন..সেই বিষয়টি নিয়ে একটা জটিলতা বা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। 

সাধারন ভাবে আমরা কি জানি, নিজের দেশে যখন কোনও নাগরিকের জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন হয়, তখন তিনি অন্য কোনও দেশের কাছে সাহায্য প্রার্থী হতে পারেন। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল, মাঝে কেটে গিয়েছে ১৭ বছর। এই ১৭ বছরে একাধিক পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। আর খুব সম্প্রতি গণঅভ্যুস্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতে তারেক রহমানের দেশে আসা আগের থেকে অনেক মসৃণ হওয়ার কথা, এবং নিজের দেশেই আর পাঁচটা স্বাভাবিক নাগরিকের মতো তিনি বসবাস করতে পারবেন। আর নিজের দেশে যদি কেউ স্বাভাবিক ভাবে বসবাস করতে পারে, যদি নিজের দেশে কোনও মানুষের জীবনে ঝুঁকি না থাকে, তাহলে কেন তিনি নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকতে যাবেন। তারেক রহমানের ক্ষেত্রে বিষয়টা হয়েছে সেটা। পরিস্থিতির চাপে তারেক রহমান আগে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, এখন পরিস্থিতি বদলেছে, তারেক রহমানের দেশে থাকার ক্ষেত্রেও আর কোনও বাধা নেই। কিন্তু তাও কেন ভয় পাচ্ছেন তারেক রহমান। এই কয়েক বছরে লন্ডনে বেশ নিজস্ব বাসস্থান এবং পরিচিতি তৈরি করে ফেলেছেন তারেক রহমান। সেই সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার ভয় পাচ্ছেন কি খালেদা পুত্র। ওয়ান ওয়ে ট্রাভেল পাস..তাৎক্ষনিক পাওয়া যায় এই পাস, এই পাসের যেমন সুবিধা রয়েছে তেমনি অসুবিধাও রয়েছে। এই ওয়ান ওয়ে ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে আপনি কোনও দেশে ঢুকতে পারবেন, কিন্তু সেই দেশ থেকে বেরতে পারবেন না। ফলে এই ওয়ান ওয়ে ট্রাভেল পাস নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে পারবেন তারেক রহমান কিন্তু এই পাস ব্যবহার করে আর লন্ডনে ফিরতে পারবেন না খালেদ পুত্র। আর লন্ডনে না ফিরতে পারার ভয়ই তাড়া করছে তারেক রহমানকে। তাহলে কি বাংলাদেশে পাকাপাকি ভাবে ফিরতে চান না তারেক ?

ইউনুসের অন্তবর্তী সরকার তারেক রহমানের উপর থেকে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরে চলতি বছরের মে মাসে ঢাকায় এসেছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবেইদা রহমান। দেখা করেছিলেন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির ৫ ও ৬ তারিখে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসাবে ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়েছিলেন তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। এই দুটি খবর আপনাদেরকে ইচ্ছা করেই দিলাম। কারন আমি ধরেই নিলাম তারেক রহমানের পাসপোর্ট সংক্রান্ত একটা সমস্যা রয়েছে। কিন্তু জুবেইদা রহমান বা জাইমা রহমানের তো সেই সমস্যা নেই দেশে ফেরার ক্ষেত্রে। তাহলে, খালেদা জিয়ার সংকটাপন্ন অবস্থা জানার পরেও কেন দেশে ফিরছেন না তারেক রহমানের স্ত্রী বা কন্যা..এই প্রশ্নটা ওঠাও তো স্বাভাবিক।

বিএনপি থেকে পাঁচ বার বহিষ্কৃত নেতা মেজর আক্তারুল জামান, তিনি মঙ্গলবার খালেদ জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে বিএনপি চেয়ারপার্সনকে দেখে বাইরে এসে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বা সমাজ মাধ্যমে তিনি বলে বেড়াচ্ছেন, বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আর জীবিত নেই। সরকার নাটক করছে খালেদা জিয়াকে নিয়ে। এবং এই অবস্থায় তাকে বিদেশে পাঠানোর জন্য টানাটানি করছে। আর বিএনপি নেতা-কর্মীদের আশ্বস্থ করছেন তারেক রহমান এটা বলে যে, তার বিড়ালের ইতিমধ্যে পাসপোর্ট হয়ে গিয়েছে আর তিনি খুব দ্রুত দেশে ফিরবেন। কিন্তু সত্যিই কি তারেক রহমানের কথায় আস্বস্ত হতে পারছেন বিএনপি নেতারা। তারা তো বরাবরই ভিড় জমাচ্ছেন হাসপাতালের সামনে। অন্যদিকে লন্ডনে খালেদা জিয়া যে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন, তিনি এসেছেন বাংলাদেশে খালেদা জিয়াকে দেখতে। বেগম জিয়াকে পরীক্ষার পরে তিনিই জানাতে পারবেন বিদেশে যাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছেন কিনা খালেদা জিয়া। তবে ইউনুসের সরকার জানাচ্ছে, বা ইতিমধ্যে জানিয়েছে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত। তাহলে হঠাৎ করে যে হাসপাতালে খালেদা জিয়া ভর্তি রয়েছেন অর্থাৎ এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে কপ্টার মহড়া হচ্ছে কেন ?এবং সরকারের তরফে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই কপ্টার মহড়ার জন্য বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে সাধারণ মানুষকে। ফলে ওয়াকিবহাল মহলের মতে, তারেক রহমান হয়তো শেষ চেষ্টা করছেন যাতে ট্রাভেল পাস বা ওয়ান ওয়ে পাস নিয়ে তাকে দেশে ফিরতে না হয়।