ট্রাইবুনাল ইস্যু কি রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াবে?

রাজ্যে বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম বাতিল হয়েছে।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : বাদ পড়া ভোটাররা কি ট্রাইবুনালের মাধ্যমে আবার ভোটের লাইনে ফিরতে পারবেন? ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্ত কি বদলে দিতে পারে একাধিক আসনের ফলাফল? সব কিছুর নিষ্পত্তি কি ভোটের আগেই সম্ভব? যাদের নাম ফিরবে না, তাদের ভোটাধিকার হারানো কি ভোটের চিত্র বদলে দেবে? হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোতে ট্রাইবুনালের প্রভাব কতটা পড়বে? ট্রাইবুনাল ইস্যু কি রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াবে? কার পক্ষে যাবে এই ট্রাইবুনাল প্রক্রিয়া? শেষ পর্যন্ত ট্রাইবুনাল কি গেম চেঞ্জার হতে পারে ২০২৬-এর ভোটে?

রাজ্যে বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম বাতিল হয়েছে। এই ২৭ লক্ষের বেশি মানুষকে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে হলে আপিল ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হতে হবে। সোমবার থেকে ট্রাইবুনালে কাজ শুরু হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্টকে জানায় হাই কোর্ট। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ লক্ষ ৩৫ হাজার ১৭৮টি আবেদন জমা পড়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় ২৭ লক্ষ বাতিল ভোটারদের একাংশের সঙ্গে আগে বাদ পড়া ভোটাররাও ট্রাইবুনালে আবেদন করে থাকতে পারেন। একইসঙ্গে যে সব বিবেচনাধীন ভোটারদের নাম ভোটার তালিকায় যোগ হয়েছে, তাঁদের নামেও আপত্তি তুলে লক্ষ লক্ষ আবেদন ট্রাইবুনালে জমা পড়েছে। সোমবার এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বলেন, যদি ট্রাইবুনালে আবেদনকারীদের ভোট দেওয়ার অনুমতি দিতে হয়, তাহলে যে সব ভোটারের নাম তালিকায় যোগ করা নিয়ে ট্রাইবুনালে আপত্তি জানানো হয়েছে, তাঁদেরও ভোট দিতে বাধা দিতে হয়।

এমন অবস্থায় কম বেশি শুরু হয়েছে ট্রাইবুনালের কাজ। অসঙ্গতির আওতায় বাদ পড়া ব্যক্তিদের আবেদন খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করে বিচারবিভাগীয় ট্রাইবুনাল। জোকায় কেন্দ্রীয় সরকারের জলসম্পদ মন্ত্রকের কার্যালয়ের ট্রাইবুনালের ২৩টি অফিস হয়েছে। সেগুলির দায়িত্বে ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। কলকাতা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, হাওড়া ও হুগলির ভোটারদের নাকি এখানেই নিষ্পত্তি হবে বলে সূত্রের খবর।

ট্রাইবুনাল চালু হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় এসেছে। যেসব নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তারা এখন এই ট্রাইবুনালে আবেদন করে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই একাধিক জেলায় প্রাক্তন বিচারকদের নিয়ে ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে এবং সেখানে আবেদন গ্রহণ ও শুনানি শুরু হয়েছে। অনলাইন ও অফলাইনে জমা পড়া হাজার হাজার আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হচ্ছে এসব ট্রাইবুনালে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাদ পড়া ভোটাররা আবার তালিকায় ফিরতে পারবেন কি না এবং তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কি না।

ট্রাইবুনাল শুরু হলেও, বাস্তবে কতটা সুরাহা হবে তা নিয়ে এখনও বেশ অনিশ্চয়তা রয়েছে। একদিকে, এই ট্রাইবুনাল বাদ পড়া ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। যেখানে তারা নথি দেখিয়ে নিজেদের নাগরিকত্ব ও ভোটার হিসেবে বৈধতা প্রমাণ করতে পারবেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ভোটাররা আবার তালিকায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অন্যদিকে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আবেদনকারীর সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। লক্ষ লক্ষ মানুষের আবেদন দ্রুত খতিয়ে দেখা ট্রাইবুনালের পক্ষে কঠিন হতে পারে। সবার কাছে প্রয়োজনীয় নথি বা প্রমাণপত্র নাও থাকতে পারে, ফলে অনেকেই সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হতে পারেন। সময়ও একটি বড় ফ্যাক্টর। ভোটের আগে সব মামলার নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাইবুনাল কিছু মানুষের জন্য নিশ্চয়ই স্বস্তি এনে দিতে পারে, কিন্তু সবার সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে। এটা বলা এখনই কঠিন। শেষ পর্যন্ত কতটা সুরাহা হবে, তা নির্ভর করবে ট্রাইবুনালের গতি, প্রমাণ যাচাইয়ের কঠোরতার ওপর।

ট্রাইবুনাল চালু হওয়ায় ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে এর প্রভাব বেশ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা যদি বড় হয়, তাহলে সেটি সরাসরি ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেখানে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। অন্যদিকে, যদি বড় সংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি না হয় বা অনেকেই প্রমাণের অভাবে বাদই থেকে যান, তাহলে একটি বড় অংশের ভোটার ভোট দিতে পারবেন না। এতে ভোটার উপস্থিতি কমতে পারে এবং রাজনৈতিক দলগুলির শক্তির ভারসাম্যও বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে এর প্রভাব বেশি পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে ভোটের মার্জিন সাধারণত কম থাকে। সব শেষে এতজন ভোটার আদৌ তালিকায় আবার নিজেদের নাম তুলতে পারবেন কিনা, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।