২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ফুটবল মানেই আবেগ। গোল, জয়, ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসা কিংবা ট্রফির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ফুটবল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে বারবার বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন অনেক ফুটবলার। এবার বিশ্ব ফুটবলে বর্নবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। মাঠের ভেতরে খেলোয়াড়দের আচরণ। প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে এবার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ফিফা। ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। সেটি ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে ভিনিসিয়াস জুনিয়র আইন নামে পরিচিতি পেয়েছে।
ভিনিসিয়াস আইনের মূল উদ্দেশ্য
মাঠে খেলোয়াড়দের মধ্যে গোপনে অপমানজনক
বৈষম্যমূলক মন্তব্য করার সুযোগ কমিয়ে আনা
এবং এমন ঘটনার তদন্তকে আরও কার্যকর করা
এই আইনের পেছনের গল্পটি শুরু হয় উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের একটি ম্যাচ থেকে। রিয়াল মাদ্রিদ ও বেনফিকার মধ্যকার প্লে-অফ ম্যাচে অভিযোগ ওঠে, বেনফিকার তরুণ ফুটবলার জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ানি ভিনিসিয়াস জুনিয়রের উদ্দেশে বর্ণবাদী মন্তব্য করেন। ঘটনাটি বিতর্কিত হয়ে ওঠে। কারণ কথা বলার সময় প্রেস্টিয়ানি নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। ফলে মাঠের অডিওতে কিছু শোনা যায়নি। ক্যামেরায় ঠোঁট পড়েও কিছু বোঝা সম্ভব হয়নি। প্রেস্টিয়ানি ও তার ক্লাব অভিযোগ অস্বীকার করলেও ঘটনাটি তদন্তে যায় এবং এই বিতর্কই ফুটবলের নতুন নিয়ম তৈরির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তীতে ফিফা ও ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড অথবা আইএফএবি সিদ্ধান্ত নেয়, মাঠে কোনো খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের মুখ হাত, জার্সি বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে ঢাকতে পারবেন না। কারণ মুখ ঢেকে কথা বললে বর্ণবাদী, অপমানজনক বা বৈষম্যমূলক মন্তব্যের প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী এমন আচরণ করলে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারবেন। এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো মাঠে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া।
যদিও এই নিয়মের সরকারি নাম ভিনিসিয়াস আইন নয়। তবুও ফুটবল বিশ্বে এটি এই নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। কারণ ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে কেন্দ্র করেই এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। ফিফা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ফুটবল মাঠে ঘৃণা, বৈষম্য কিংবা বর্ণবাদের কোনো স্থান নেই। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নতুন এই নিয়ম প্রথমবারের মতো কার্যকর হয়। প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার মিগেল আলমিরন তুরস্কের ডিফেন্ডার মের্ত মুলদুরের সঙ্গে তর্কের সময় নিজের মুখ ঢেকে কথা বলেছিলেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী রেফারি তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। এর মাধ্যমে আলমিরন ভিনিসিয়াস আইনের আওতায় লাল কার্ড পাওয়া প্রথম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। একই বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনও লাল কার্ড দেখে আলোচনায় আসেন। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে একটি ট্যাকলের পর ভিএআরের সহায়তায় রেফারি ঘটনাটি পুনরায় দেখে তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী তিনি পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ হন এবং এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আপিলের সুযোগ ছিল না। এই ঘটনা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে লাল কার্ডের গল্পও কম রোমাঞ্চকর নয়। ১৯৩০ সালে পেরুর প্লাসিদো গালিন্দো ছিলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম বহিষ্কৃত ফুটবলার। তবে তখন লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। ১৯৭০ সালে হলুদ ও লাল কার্ড চালু হলেও প্রথমবার মাঠে লাল কার্ড দেখানো হয় ১৯৭৪ সালে চিলির কার্লোস কাসেলিকে। এরপর ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে জিনেদিন জিদানের বিখ্যাত হেডবাট কিংবা ২০১০ বিশ্বকাপে লুইস সুয়ারেজের হাত দিয়ে নিশ্চিত গোল ঠেকানোর ঘটনা আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।
ফুটবল প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বাড়ছে। তেমনি বাড়ছে খেলাটিকে আরও সুষ্ঠু ও মানবিক করে তোলার প্রচেষ্টাও। ভিনিসিয়াস আইন সেই পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলোয়াড়দের গায়ের রং, জাতি, ভাষা বা পরিচয় নয়। তাদের প্রতিভা ও পারফরম্যান্সই হবে বিচার করার একমাত্র মাপকাঠি।
ফুটবল আনন্দের খেলা, ঐক্যের খেলা এবং কোটি মানুষের আবেগের জড়িয়ে রয়েছে এই খেলার মধ্যে। ভিনিসিয়াস আইন নিয়ে আপনাদের মতামত কী। এই নিয়ম কি ফুটবলের বর্ণবাদ ও অপমানজনক আচরণ কমাতে পারবে। নাকি এর অপব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে?