ভোটের কাজে আপনার গাড়িও নিতে পারে !

সত্যিই কি ভোটের জন্য কোনও ব্যক্তিগত গাড়ি নিতে পারে পুলিশ?

শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : ভোট এসে গিয়েছে। রাজ্যের প্রতিটি কোণায় কোণায় শোনা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভারী বুটের শব্দ। এদিকে, ভোট আসতেই রাস্তা থেকে বাস-অটো কমতে শুরু করেছে। এই আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিয়ো ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। তা নিয়ে তুমুল চর্চা-বিতর্কও শুরু হয়েছে। সত্যিই কি ভোটের জন্য কোনও ব্যক্তিগত গাড়ি নিতে পারে পুলিশ?

নির্বাচন আয়োজন এবং পরিচালনা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, নির্বাচনের কাজের জন্য সরকারি ও বাণিজ্যিক গাড়ি অর্থাৎ হলুদ নম্বর প্লেটের কমার্শিয়াল গাড়ি নেওয়া যেতে পারে। প্রাইভেট গাড়ি অর্থাৎ ব্যক্তিগত গাড়ি নেওয়া যায় না। তবে শহরের অবস্থার উপরে নির্ভর করে কমিশন শেষ অপশন হিসাবে কিছু প্রাইভেট গাড়ি নেওয়ার বিধান রেখেছে। এক্ষেত্রে এসইউভি গাড়িকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

কীভাবে গাড়ি নিতে পারে কমিশন?
প্রাইভেট গাড়ি চাইলেই পুলিশ মাঝ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে নিয়ে নিতে পারে না। তার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। যদি একান্তই গাড়ির প্রয়োজন হয়, তবে পুলিশকে রিক্যুইজিশন দিতে হবে। এই প্রক্রিয়াটাও দুইভাবে হয়। এক, জেলাশাসক, যিনি নির্বাচনের সময় জেলা নির্বাচনী অফিসার হিসাবে কাজ করেন, তিনি টেন্ডার ডাকেন এবং নির্বাচনের জন্য় গাড়ি চান। আরেকটি অপশন হল, ওসি-ইলেকশন, যিনি নাকা বা আরটিও-তে কাজ করেন, তিনিও রিক্যুজিশনের মাধ্যমে প্রাইভেট গাড়ি চাইতে পারেন।

যদি আপনি গাড়ি দিতে না চান, তাহলে কী করবেন?
যদি আপনার গাড়ি নির্বাচনী ডিউটির জন্য চাওয়া হয়, কিন্তু আপনার দরকারি কাজ থাকে এবং গাড়ি দিতে আপনি নারাজ হন, তাহলে আপনি সরাসরি ডিইও বা নির্বাচন কমিশনের সিইও-র কাছে আবেদন করতে পারেন। আপনাকে সেক্ষেত্রে ব্যাখ্যা দিতে হবে যে কেন গাড়িটি দরকার আপনার।

কী বলছে কলকাতার হাইকোর্টের রায়?
এই নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের ২০০৬ সালের একটি মামলার রায়ও রয়েছে। সেই মামলার রায়ে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫১-র অধীনে সরকারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা হয়েছিল। অনির্বাণ ঘোষ বনাম ডিস্ট্রিক ইলেকশন অফিসারের ওই মামলায় তৎকালীন বিচারপতি গিরিশ চন্দ্র গুপ্ত বলেন যে প্রাইভেট গাড়ি বা বাস, যা ব্যক্তিগত ব্যবহার করা হয়, তা যথেচ্ছভাবে নেওয়ার জন্য রাজ্য রিক্য়ুইজিশন দিতে পারে না।

আইন কী বলছে?
জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৬০ ধারার উল্লেখ করে বলা হয়, গাড়ির রিক্যুইজিশনের কথা বলা হলেও, তা সাধারণভাবে কমার্শিয়াল গাড়ি এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টকেই বোঝানো হয়েছে। প্রাইভেট গাড়ি, যা ব্যক্তিগত মালিকানায় রেজিস্টার্ড এবং ভাড়া দেওয়া হয় না, তা ডিস্ট্রিক ইলেকশন অফিসার জোর করে নির্বাচনের কাজের জন্য নিতে পারেন না। ১৬০ ধারায় কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রার্থী বা তাঁর এজেন্ট নির্বাচন সংক্রান্ত কাজের জন্য প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন।

গাড়ি নিলে কত টাকা পাবেন?
গাড়ি দৈনিক ভাড়া
বাস ২,৭৮০ টাকা
মিনিবাস ২,৩০০ টাকা
সাত আসনের গাড়ি ৯৮০ টাকা
অটো ৫৫০ টাকা
মালবাহী গাড়ি ৯৮০ টাকা
ট্রাক ২,২৪০ টাকা
লঞ্চ ৩,১০০ টাকা
নৌকা ৩,৫৫০ টাকা


প্রতিটি নির্বাচনী কাজের জন্য কমিশন গাড়ি নিলে, তার জন্য দৈনিক একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়। বাস নিলে, তার জন্য দৈনিক ২৭৮০ টাকা, মিনি বাসের জন্য দৈনিক ২৩০০ টাকা দেওয়া হয়। সাত আসনের গাড়ি নিলে তার জন্য দৈনিক ৯৮০ টাকা, অটোর জন্য ৫৫০ টাকা এবং ই-রিক্সার জন্য ৮৫০ টাকা দেওয়া হয়। ছোট মালবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে ভাড়া দৈনিক ৯৮০ টাকা এবং বড় ট্রাকের ক্ষেত্রে ২২৪০ টাকা করে দেওয়া হয়। লঞ্চ বা নৌকার মতো কোনও জলযানের জন্য দৈনিক ৩১০০ টাকা থেকে ৩৫৫০ টাকা দেওয়া হয়। অবজার্ভারদের জন্য নেওয়া এসি গাড়ির ভাড়া ১৩৫০ টাকা এবং বড় গাড়ির ভাড়া ১৬৯০ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া চালক, খালাসিদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য দৈনিক ২৮০ টাকা খরচ বরাদ্দ করা হয়েছে।