বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন ইউনুস। তাঁকে একপ্রকার অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : দেশে নয়া সরকার ক্ষমতায় আসতেই মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহাবুদ্দিন ৷ ইউনুস এই মুহূর্তে দায়িত্বে না থাকলেও তার কীর্তি কলাপ সম্পর্কে অবগত সকলেই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানান, গত ১৮ মাসে একাধিকবার তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে হঠানোর চেষ্টা করেছেন পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস । তিনি বলেন, “আমি তিন সেনা প্রধানের কাছ থেকে বিপুল সাহায্য পেয়েছি ৷ বিভিন্ন সময়ে এই সাহায্য আমার নৈতিক শক্তিকে অটুট রেখেছে ৷ তাঁরা আমায় একটাই কথা বলেছিলেন আপনি সেনাবাহিনীর সুপ্রিম কম্যান্ডার ৷ আপনি পরাজিত হওয়ার অর্থ পুরো সেনাবাহিনীর হার৷ আমরা যে কোনওভাবে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব ৷ আর সব শেষে তাঁরা সেটাই করে দেখিয়েছেন ৷ ইউনূসের শাসনকালে সংবিধান লঙ্ঘনের বহু চেষ্টা হয়েছে। ইউনূসের কার্যপদ্ধতি নিয়ে যে তাঁর অসন্তোষ রয়েছে, তা নিয়ে কোনও রাখঢাক করেননি সাহাবুদ্দিন।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনও বিধান মেনে চলেননি। সংবিধানে বলা আছে, উনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমাকে ওই আউটপুটটা জানাবেন। কী আলোচনা হল, কী হল, কোনও চুক্তি হল কি না, কী ধরনের কথাবার্তা হল— এটা আমাকে লিখিত ভাবে অবহিত করার কথা। উনি তো বোধহয় ১৪-১৫ বার বিদেশ সফরে গিয়েছেন। একবারও আমাকে জানাননি। একবারও আমার কাছে আসেননি। সাহাবুদ্দিনের কথায়, ওই দেড় বছর তিনি কোনও আলোচনায় ছিলেন না। অথচ তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন চক্রান্ত চলছে। তিনি বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে। কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকায় কোনও ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি বলে জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। সাহাবুদ্দিন আরও বলেন, অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভাল, তা বলা যাবে না। এমনকি আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও ইউনূসের তৎকালীন প্রশাসন তাঁকে কিছুই জানায়নি বলে দাবি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কোনও কিছুই আমি জানি না। এই রকম একটা চুক্তি অবশ্যই আমাকে জানানো দরকার ছিল। এটা ছোটখাটো হোক আর বড় কিছু হোক, অবশ্যই আগের সরকারপ্রধানেরা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। আর এটি হল সাংবিধানিক একটা বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি তো তা করেননি।” লিখিত বা মৌখিক— কোনও ভাবেই ইউনূস তাঁকে জানাননি বলে দাবি সে দেশের রাষ্ট্রপতির। ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রপতি পদকে এড়িয়ে য়াওয়া বা খাটো করার অভিযোগ তুলেছেন শাহাবুদ্দিন। তাঁর দাবি, রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার পরেও ইউনূস তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে যান। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমিই ছিলাম সেই প্রক্রিয়ার উৎস যার মাধ্যমে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলেন, তবুও তিনি কখনও আমার সঙ্গে সমন্বয় করেননি। তিনি একবারও আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি এবং আমাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।” রাষ্ট্রপতি আরও অভিযোগ করেছেন যে, পরামর্শ ছাড়াই তাঁর বৈদেশিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কসোভো এবং কাতার থেকে আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মকর্তারা তাঁর নামে সফর বাতিলের জন্য চিঠি তৈরি করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের কথায়, “একটি চিঠি তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে আমি রাষ্ট্রীয় কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলাম এবং তাই বিদেশ সফরে উপস্থিত থাকতে পারছিলাম না। এটা প্রস্তুত করার আগে আমার সঙ্গে কোনও আলোচনা করা হয়নি। তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, “আমাদের সংবিধানের অধীনে কি একজন রাষ্ট্রপতি এত ব্যস্ত থাকেন?” শাহাবুদ্দিন আরও দাবি করেন যে, দেশে এবং বিদেশে তাঁর উপস্থিতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, তাঁরা চায়নি যে আমার নাম কোথাও প্রকাশিত হোক। তারা আমাকে অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করেছিল যাতে মানুষ আমাকে চিনতে না পারে। শাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেন যে, তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন এবং রাষ্ট্রপ্রধানের সভাপতিত্বে ঐতিহ্যগতভাবে অনুষ্ঠিত অন্যান্য জাতীয় অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। বিদেশ সফরের সময় একজন উপদেষ্টার আপত্তি জানানোর পর বিদেশের বাংলাদেশি মিশনগুলি থেকে তাঁর সরকারি ছবি রাতারাতি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। রাষ্ট্রতির দাবি, “বিশ্বজুড়ে, দূতাবাস এবং হাইকমিশন রাষ্ট্রপতির ছবি প্রদর্শন করে কারণ রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিষয়টিকে সম্ভবত তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারণের প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করেন মহম্মদ শাহাবুদ্দিন। শাহাবুদ্দিন দাবি করেছেন যে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারণের জন্য বারবার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। রাষ্ট্রপতির কথায়, একজন উপদেষ্টা বিচারকের কাছে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি উপরে আছেন এবং তিনি অবৈধভাবে এই পদ গ্রহণ করতে পারেন না। অর্থাৎ মহম্মদ ইউনূস যে বাংলাদেশের প্রদানের কুর্সিতে বসতে চেয়েছিলেন তা স্পষ্ট। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে।” কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকায় কোনও ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি বলে জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। সাহাবুদ্দিন আরও বলেন, “অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভাল, তা বলা যাবে না।” বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দাবি, প্রাথমিক ভাবে গণঅভ্যুত্থানের কয়েক জন নেতার চাপে তাঁকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল। ওই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রাজনৈতিক দলগুলি চাইলে তবেই তাঁকে অপসারণ করা যাবে। তবে বিএনপি-র এক শীর্ষনেতা ওই সময়ে তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই। কোনও অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই।” সাহাবুদ্দিন জানান, রাজনৈতিক স্তরে ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পরে অন্তর্বর্তী সরকারই এ বিষয়ে পদক্ষেপ করে। এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে অসাংবিধানিক উপায়ে তাঁর জায়গায় বসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে এমনটাই অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা ওই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু ওই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমন ‘অসাংবিধানিক কাজে’ রাজি হননি। ফলে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয় বলে দাবি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির।