বিদায় বেলাতেও ইউনুসের কূটনৈতিক চাল!

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই ইস্যুতে ইউনুস কী অবস্থান নেন, এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন কৌশল বেছে নেন, সেটাই এখন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ইতিহাসের বাঁকে দাঁড়িয়ে কখনও কখনও কূটনীতি হয়ে ওঠে নিঃশব্দ অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এক ভাষা। যেখানে একটি সিদ্ধান্ত, একটা বদলি যা একটি নতুন নিয়োগ ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশ ঠিক করে দিতে পারে। ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক। ঢাকায় তারেক রহমানের শপথগ্রহণের ঠিক আগের মুহূর্তে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ঢাকায় ভারতের পরবর্তী হাই কমিশনার হিসেবে সন্দীপ চক্রবর্তীর সম্ভাব্য নিয়োগ। দুটি ঘটনাই কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই সময়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন কেবল প্রশাসনিক রদবদল নয় বরং ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করছে। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনের প্রেস উইং দীর্ঘদিন ধরেই দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সেতু হিসেবে কাজ করেছে। সেই জায়গায় দায়িত্ব থাকা ফরসাল মাহমুদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তুলেছে। কারণ, ২০২৪ সালের অগাস্টে মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দু’বছরের চুক্তিতে তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী আরও অন্তত নয় মাস তাঁর দায়িত্বে থাকার কথা ছিল। অথচ হঠাৎ করেই জনপ্রশাসন মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হল চুক্তির নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী, তাঁর অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হচ্ছে এবং এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপের কোনও ব্যাখ্যা না আসায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে এই রদবদলের তাৎপর্য নিয়ে জল্পনা আরও ঘনীভূত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও তাৎপর্যময় করে তুলেছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যারিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির জয় এবং দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণের প্রস্তুতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান, যেখানে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। এই আনুষ্ঠানিকতা কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক নয়, বরং আগামী দিনে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক কোন পথে এগোবে তারও একটি সূচক। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান। গণঅভ্যুন্থানের জেরে ২০২৪ সালের অগাস্টে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন ও এখনও দিল্লিতেই রয়েছেন বলে সূত্রে খবর। তাঁকে দেশে ফেরানোর জন্য ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে, কিন্তু ভারত এখনও পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট জবাব দেয়নি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই ইস্যুতে তিনি কী অবস্থান নেন, এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন কৌশল বেছে নেন সেটাই এখন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক।

ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই সামনে আসছে সন্দীপ চক্রবর্তীর নাম। যা কূটনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি কৌতূহল ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। ১৯৯৬ ব্যাচের ভারতীয় বিদেশ পরিষেবা তথা আইএফএস আধিকারিক সন্দীপ চক্রবতীর কূটনৈতিক জীবন অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমখী। বর্তমানে সন্দীপ চক্রবর্তী ইন্দোনেশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পূর্ব তিমুরেও ভারতের রাষ্ট্রদূতের অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। অভিজ্ঞ ও সুপরিচিত কূটনীতিক হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক জটিলতা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ও বিশেষ করে বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঢাকায় ভারতের পরবর্তী হাই কমিশনার হিসেবে তাঁর নিয়োগ হলে তা নিছক প্রশাসনিক রদবদল নয় বরং একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবেই ধরা হবে। কারণ, এই মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দাঁড়িয়ে রয়েছে বহুস্তরীয় সমীকরণের সামনে। যেখানে একদিকে রয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, নদীজল বন্টন ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা। অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক আস্থা, পারস্পরিক সংবেদনশীল ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। সন্দীপ চক্রবর্তীর কূটনৈতিক দক্ষতা, সংযত অথচ দৃঢ় আলোচনাশৈলী এবং সংকটকালে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এই সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য দূরত্ব কমাতে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক আশ্রয়, প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত কূটনৈতিক জটিলতা এবং নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা। এই সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর ধারনার কারণেই তাঁকেই ঢাকায় ভারতের পরবর্তী হাই কমিশনার হিসবে ভাবা হচ্ছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।

ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর মোড়ে, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, অন্যদিকে ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের পুনর্গঠন। এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার পথে এগোবে, না কি অতীতের কিছু বিতর্কিত ইস্যু নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করবে তার উত্তর তো সময়ই দেবে। তবে এই মুহূর্তে সন্দীপ চক্রবর্তীর সম্ভাব্য নিয়োগ ফরসাল মাহমুদের হঠাৎ অপসারণ এবং শপথগ্রহণের ঠিক আগের এই কূটনৈতিক তৎপরতা একসঙ্গে মিলিয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ হয়তো নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে চলেছে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে তাই প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রতিটি নীরব বার্তা এবং প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হয়ে উঠছে আগামী দিনের রাজনীতির মানচিত্র আঁকার নীরব অথচ শক্তিশালী ভূমিকা।